কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য রোধে প্রয়োজন অধিকতর সচেতনতা

0
7

কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য রোধে প্রয়োজন অধিকতর সচেতনতা

মোহাম্মদ নাদের হোসেন ভূঁইয়া

এমন একটা সময় ছিলো যখন একটি কিশোর গ্যাং ছেলে-বুড়ো সবার কাছেই প্রিয়।সেই কিশোর গ্যাংয়ের নাম হলো ‘তিন গোয়েন্দা’।দলটির প্রধানের নামও কিশোর।কিন্তু বর্তমান অবস্থায় কিশোর গ্যাং’ একটি বড় আতঙ্কের নাম।ইদানীং পত্রপত্রিকায় কিশোর গ্যাংয়ের খবর আমরা নিয়মিত পড়ছি।বিশেষজ্ঞদের মতে সমস্যাটি মারাত্মক আকার ধারণ করছে। একটি প্রতিবেদন থেকে দেখতে পেলাম কিভাবে ১৮ বছরের কিশোর বন্ধুদের সহায়তায় নিজের অপহরণ ঘটনা সাজিয়ে পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে একজন।কিভাবে অনলাইন গেম পাবজি মাধ্যমে অন্য কিশোরীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে,ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও আদান- প্রদান করে এবং শেষে ব্ল্যাকমেল করার মত অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে।প্রতিবেদনে আরো বলা হয় পুলিশ ওই কিশোর গ্যাংয়ের হাইটেক ডিভাইস থেকে ছবি ও ভিডিও উদ্ধার করে।হাইটেক ডিভাইস কি জানা না গেলেও ধারণা করা হয় যে পেশাদার অপরাধী হয়ে উঠার জন্য সব রকমের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা তারুণ্যে পা রাখছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে তৈরী হয় এই গ্যাং?

মূলত আধিপত্য বিস্তর কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা এই কিশোররা একসময় গ্যাং আকারে রূপান্তরিত হয়ে গড়ে উঠে ভয়াবহ কিশোর গ্যাং।এই নিয়ে তুলে ধরালাম একটি কিশোরের কিশোর গ্যাং তৈরীর গল্প।যার নাম তানিম আহমেদ(ছদ্মনাম) একসময় একটি কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।বছর কয়েক আগে তার সমবয়সী কিশোরদের নিয়ে এই গ্যাংটি সে নিজেই গড়ে তুলেছিল। মূলত অন্যদের আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচাতে তৈরী করেন এই গ্যাং।ধীরে ধীরে এর আয়তন আরো বাড়তে থাকে।এমন করে তৈরী হয় আমাদের এই আত্মরক্ষা মূলক গ্যাং।দেয়ালে দেয়ালে স্প্রে দিয়ে গ্যাংয়ের নাম লিখছে।পরে আমরা দেখলাম এটা একটা ট্রেন্ড।সবাই গুণ্ডামি করছে,গ্যাং বানাচ্ছে।তখন আমরাও শুরু করলাম।৫-৬ টা গাড়ি নিয়ে একসাথে ঘুরতাম। একসময় বেশ বড় একটা গ্যাং তৈরী হয় আমাদের।তবে গ্যাং তৈরী হওয়ার কিছু দিন পর খুব দ্রুতই অন্য অন্য এলাকার গ্রুপগুলোর সঙ্গে আমাদের সংঘাত তৈরী হয়।অনেক সময় তুচ্ছ কারণেও ঘটতো মারামারির ঘটনা।এক এলাকার ছেলে অন্য এলাকায় গেলে মারধরের ঘটনা ঘটতো। কাওকে গালি দিলে,যথাযথ সম্মান না দেখালে এমকি বাঁকা চোখে তাকানোর কারণেও মারামারির ঘটনা ঘটেছে।সিনিয়র জুনিয়র দ্বন্দ্ব থেকেও অসংখ্য মারামারির ঘটনা ঘটেছে বলে জানায় তানিম।আমাদের গ্যাং একসময় আর্মস ক্যারি(অস্ত্র বহন)করা শুরু করি।এইসব দিয়ে মাঝে মাঝে ফাঁকা ফায়ারিং করা হতো।তবে আমরা কাওকে গুলি করিনি এখোনো।এরি সাথে সাথে তাদের গ্রুপে হানা দেয় মাদক।তাদের গ্যাংয়ের কিছু সদস্য লোভে পড়ে যায়।তারা চিন্তা করে কি ভাবে এই গ্রুপকে কাজে লাগিয়ে টাকা আদায়ের ধান্দা করা যায়।শুরু হয় ছিনতাই,মাদক সহ নানারকম ভয়ানক অপরাধ।যা একসময় চরম পর্যায় চলে আসে।দুই জন বিভিন্ন অপরাধে জেল খাটে।ফলে নিজেকে রক্ষার্থে একসময় নিজের গ্যাং থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আনতে বাধ্য হন তানিম আহমেদ।এর থেকে অনেকটা পরিষ্কার বুঝা যায় কি ভাবে আমাদের দেশের সম্ভাবনাময় কিশোরা জড়িয়ে পড়ে ভয়ঙ্কর সব অপরাধ জগতে।ফলে অধিকাংশ কিশোরে জীবন শেষ হয়ে যায় এই নির্মম বাস্তবতায়।

সম্প্রীত বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং কালচার বেড়েই চলছে।এক প্রতিবেদনে দেখা যায় রাজশাহী অপরাধ মোকাবেলায় ৪০০ টি কিশোরের তথ্যভাণ্ডার।ডিএমপির অপরাধ পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী শুধুমাত্র ঢাকার বিভিন্ন এলাকাজুড়ে ৪০ টির মত কিশোর গ্যাং রয়েছে।প্রতিটি গ্যাংয়ের সদস্যা সংখ্যা প্রায় ১৫-২০ জন।পুলিশ সূত্রে জানা যায় গত একবছরে ঢাকায় অন্তত পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তারা।এরিমধ্য,উত্তরার কিশোর গ্যাং বেশ আলোচিত। সেখানে একাধিক গ্যাং রয়েছে।২০১৭ সালের জানুয়ারিতে উত্তরার ডিসকো এবং নাইট স্টার গ্রুপের দ্বন্দ্বে নিহত হয় কিশোর আদনান কবির।তার পরের মাসে তেজকুনি পাড়ায় দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে নিহত হয় কিশোর আজিজুল হক।বরগুনার নয়ন বন্ড তার সাত গ্রুপ নিয়ে জনসম্মুখে রিপাত শরিফ কে কুপিয়ে হত্যা করে।এই হত্যার জন্য ১১ কিশোরকে কারাদণ্ড দিয়ে বরগুনার আদালত বলে,সারা দেশে কিশোর অপরাধ বেড়েই চলেছে।গডফাদাররা এই কিশোরদের ব্যবহার করছে।গত বছর সাভার স্কুল ছাত্রী লিনা হত্যায় কিশোর গ্যাং জড়িতো।ওই বছরের ৯ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দুই কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধে নাঈম নামের এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।আবার ওই কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় গত বছরের পহেলা এপ্রিল শরিফ হোসেন নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।১৭ বছরে ঢাকায় কিশোর অপরাধীদের হাতে নিহত হয় প্রায় ১২০ জন।এর মধ্যে গত দুই বছরে ৩৪ জন নিহত হয়েছে।এই পরিসংখ্যান থেকে বুঝা যাচ্ছে ঢাকায় কিশোর অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া।এইসব ঘটনায় চার শতাধিক কিশোরকে আসামী করা হয়েছে।এছাড়াও ঢাকার বাহিরে থেকে প্রায়ই কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়।সারা দেশে চলছে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াল তাণ্ডব।ঢাকার বাইরেও অর্থাৎ বিভিন্ন বিভাগ ও মফস্বল শহরগুলোতে এখন সক্রিয় হচ্ছে কিশোর গ্যাং।কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের তথ্য মতে যে কিশোররা ওই সব কেন্দ্রে আছে তাদের ২০ শতাংশ হত্যা,২৪ শতাংশ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামী।এক জরিপে দেখা যায় ১৪ থেকে ১৬ বছরের কিশোররাই বেশী অপরাধে জড়াচ্ছে।আরেক জরিপে দেখা যায় ঢাকায় সব অপরাধে ৪০ শতাংশই কিশোর গ্যাং দ্বারা হয়ে থাকে।

দিন দিন বেপরোয়া হচ্ছে কিশোর গ্যাং।এইসব বিপদগামী কিশোরদের ভয়াল থাবায় প্রাণ হারাচ্ছে কত মানুষ,ভুল পথ পা বাড়াচ্ছে কতশত কিশোর।এখনই সময় বেপরোয়া এইসব কিশোরদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর।তাদের সঠিক পথে নিয়ে আসা।এই ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী সচেতন হতে হবে পরিবারকে।কারন একটি শিশু,কিশোরের প্রধান আশ্রয়স্থল তার পরিবার।এইটি পরিবার সন্তানকে যত বেশী গাইডলাইন করবে এই সন্তান ততবেশী সঠিক পথে থাকবে।কিন্তু পরিবার যদি সন্তানে ব্যাপারে হয় উদাসীন তাহলে ওই কিশোরতো খারাপের দিকে পা বাড়াবেই।তাই আমাদের পরিবার গুলো আগে সচেতন হতে হবে।আপনার সন্তান কোথায় যাচ্ছে,কি করছে,কার সাথে মিশছে এইসব দেখা হতে হবে একটা পরিবারে প্রধান দায়িত্ব।সন্তানে নুন্যতম খারাপ আচরণ দেখলে তাকে সচেতন করতে হবে।ভালো মন্দ বুঝাতে হবে।আমাদের সমাজে অনেক বাবা মা কাজে এতোটাই ব্যাস্ত থাকেন যে তাদের সন্তানদের নুন্যতম সময় পর্যন্ত দিতে পারেন না।ওই সন্তানে অনেক সময় নিসঙ্গতায় ভোগে।অনেক কিশোর হয়ে পড়ে হতাশাগ্রস্ত।ফলে ওই কিশোরটা খারাপ পথে পা বাড়াতে দ্বিধাবোধ করে না।তাই পরিবার গুলোকে অবশ্যই তাদের সন্তানদের যাথাযথ সময় দিতে হবে।পরিবারিক গল্প,আড্ডায় মাধ্যমে তাদের মন ভালো রাখতে হবে।তাই বলা যেতে পারে একটা কিশোরের সঠিক জীবনযাপনে পরিবারের ভূমিকা মূখ্য।

তবে এইক্ষেত্রে আমাদের সমাজ ব্যবস্থাও কিছুটা দায়ী।কারণ আমাদের দেশে বা সমাজে এমন হাজারো গ্যাং কালচারে ভর্তি।ফলে একটি ভালো কিশোর যখন এইসব কিশোরদের সাথে মিশে তখন সেও ধীরে ধীরে ওই কিশোর গ্যাংয়ের অংশ হয়ে যায়।জড়িয়ে পড়ে নানারূপ অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ডে।তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে আমরা নিষ্পাপ কিশোরদের জন্য কতটা নিষ্পাপ পরিবেশ রাখতে পারছি?অভিযোগ আছে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিক নেতা তাদের শক্তি যোগায়।তাদের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে।তারা অনেকটা বড় ভাই হিসেবে কিশোরদের কাজে প্রভাববিস্তার করে।তদের সব ঘটনার নেপথ্য থাকে বড় ভাই নামের প্রভাবশালী রাজনীতির নেতারা।অনেক সময় প্রভাবশালী নেতাদের দাপটে অপরাধী কিশোররা রয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে।তাই আগে আমাদের মনোভাবের পরিবর্তন করতে হবে।এই সব কিশোররা আগামীর ভবিষ্যৎ,আগামীর দেশ গড়ার কারিগর।তাই তাদের স্বার্থে,আমাদের দেশের স্বার্থে এইসব কিশোরদের খারাপ কাজে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়।যেই সমাজে একটি কিশোর খারাপের দিকে পা বাড়ানোর কোন উপায় খুজে পাবে না।

বেপরোয়া এইসব কিশোর গ্যাং রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ তৎপর।কিন্তু কিছুতেই যেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না কিশোরদের এই অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড।আইনি জটিলতায় কিশোরদের কঠোর বিচার ব্যবস্থা না থাকায় অনেকটা অভয়ে তারা জড়িতে পড়ে অপরাধ জগতে। বাংলাদেশের শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছর বা এর কম বয়সী যেসব শিশু কিশোরের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদেরকে জেলে নেয়ার পরিবর্তে উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে – যেন তারা সংশোধিত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।আইনে আরো বলা আছে,নয় বছরের কম বয়সী শিশুকে কোনো অবস্থাতেই গ্রেপ্তার বা আটক করা যাবে না। নয় বছরের ওপরে কোনো শিশুকে গ্রেপ্তার করার পর তাকে হাতকড়া বা কোমরে দড়ি লাগানো যাবে না।সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান বলেন, কাউকে আটক করা হলেও তাকে থানায় আলাদা প্রোবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে অন্য অপরাধীদের থেকে আলাদা রাখার নিয়ম রয়েছে।পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজির আহমেদ এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছিলেন যে, বাংলাদেশে আইনের জটিলতা, জনবলের অভাব এবং অবকাঠামোর অভাবে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।মহাপরিদর্শক আরো বলেন”কিশোর অপরাধ করলে মোবাইল কোর্ট করা যেতো, এখন হাইকোর্ট বলেছে না এটা করা যাবে না। মোবাইল কোর্ট করা যাবে না, নরমাল আদালতে বিচার করা যাবে না, জেলে রাখা যাবে না, রাখবো কোথায়? বিচারে পাঠাবো কোথায়?” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান অবকাঠামোতে শিশু বা কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।তবে এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য অনেক সময় পদক্ষেপ নেয়া হলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বেশিরভাগ সময়েই তা সম্ভব হয় না।অনেক সময় প্রশাসনিক কিছু জটিলতার কারণে দেখা যায় যে, কোন এক কর্মকর্তাকে শিশু বা কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে কিভাবে ডিল করতে হবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনার পর হয়তো সে অন্য কোথাও বদলি হয়ে গেল। কিংবা ওই থানাতেই অন্য কোন দায়িত্বে চলে গেল।”তখন আর ওই থানায় এ বিষয়ক প্রশিক্ষিত কোন কর্মকর্তা থাকে না” সুতরাং দেখা যাচ্ছে,আইনি জটিলতাশ অনেক সময় গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত শিশু-কিশোরদের বিচার এ আদালত আমলে নিতে পারেন না।

কিশোর গ্যাং রোধে পরিবর্তন আনতে হবে বিচারব্যবস্থায়।এইক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে মানসিক বয়স।অনেক কিশোর যাদের বয়স কম হলেও তাদের বুদ্ধিবৃত্তি অনেক ভালো।অর্থাৎ তারা মানসিক ভাবে অনেকটা প্রাপ্তবয়স্ক বা পরিপক্ব।অনেকক্ষেত্রে তারা প্রাপ্তবয়স্কদের চাইতেও অনেক পরিপক্ব। নূর মোহাম্মদও মনে করেন, মানসিক বয়সও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন৷ কারণ পুরোপুরি পরিকল্পনা করে ফৌজদারী অপরাধ করার সক্ষমতা যার আছে তার সাধারণ বয়স ১৮-এর নিচে হলেও মানসিক বয়স বেশি৷বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার চার কোটি শিশু-কিশোর৷
এরমধ্যে এক কোটি ৩০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর আইন ও অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন মনে করেন, ‘‘ওই শিশুরা তো অপরাধে জড়িয়ে পড়তেই পারে৷’’রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার শিশুদের জন্য শিশুবান্ধব পরিবেশ দিকে ব্যর্থ হচ্ছে৷ তাদের মধ্যে মূল্যবোধ তৈরি করতে পারছে না৷ যার পরিণতি আমরা এখন দেখছি বলে তিনি মনে করেন৷তবে পরিবারের নজরদারি ও মূল্যবোধ এই কিশোর অপরাধ অনেক কমিয়ে আনতে পারেন বলে মনে করেন তিনি৷

শিশু-কিশোর অপরাধের বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে অপরাধের কারণ ও ধরন এবং তাদের অধিকার, মানবিক মর্যাদা, সংশোধনের সুযোগ ও অন্য কল্যাণকর দিকগুলো আইন অনুসারে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। অথচ এগুলো সুনির্দিষ্টভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।মি. রহমান বলেন,শিশুদের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করা গেলে বর্তমান অবকাঠামোর আওতাতেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।তিনি বলেন,এগুলো ধীরে ধীরে পরিবর্তন করা সম্ভব যদি মানসিকতাটা আমাদের সেরকম হয়।সবারই দায় রয়েছে, বাংলাদেশে কিশোর অপরাধীদের জন্য মোট তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র আছে। এর মধ্যে ছেলেদের জন্য টঙ্গি ও যশোরে দুটি এবং গাজীপুরে মেয়েদের জন্য একটি।আধুনিক সমাজে পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার গঠন এবং জীবনযাত্রা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়াটাও শিশু-কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার একটা বড় কারণ।শিশু কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়া, বিভিন্ন ধরণের বিনোদনের সুযোগ কমে যাওয়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ না নেয়াও অপরাধ-প্রবণতার বড় কারণগুলোর অন্যতম।একটি শিশু বা কিশোর যখন আনন্দ বিনোদন,খেলাধুলা অর্থাৎ দৈনন্দিন তার যে অধিকার,স্বাধীনতা বা চাহিদা রয়েছে সেটা পর্যাপ্ত পরিমাণে উপভোগ করতে পারে সেই ছেলে কখনো খারাপের পথে পা বাড়াবে না।

নিষ্পাপ এই কিশোরদের কিশোর গ্যাং রূপে রূপান্তরিত হবার পেছন দায়ী আমি,আপনি তথা আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থা।কিশোরদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে প্রথমে জাগ্রত করতে হবে আমাদের মূল্যবোধ,সচেতন হতে হবে আমাদের পরিবার গুলোকে,সচেতন হতে হবে সমাজ ব্যবস্থাকে।বিচারব্যবস্থায় আনতে হবে সৃজনশীলতা।শিশুকিশোরদের আনন্দ বিনোদনের জন্য রাখতে হবে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা।শহরগুলোতে রাখতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে খেলার মাঠ।যার বড়ই অভাব এখন রাজধানীতে।যার প্রভাব পড়ছে শিশু-কিশোরদের উপর।তারা খেলাধুলার সুযোগ না পেয়ে মোবাইল ফোনে সময় কাটাচ্ছে।অতি মাত্রায় খেলছে গেমস।ফলে তারা আসক্ত হয়ে যাচ্ছে ইন্টারনেট দুনিয়ায়।যা তাদের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।অনলাইন গেমস পাবজির সহ নানা গেমসের মাধ্যমে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে কথা আমরা অনেক শুনেছি।কিশোরদের এমন অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ডে রোধে নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই।তাই প্রতিটি শিশু-কিশোরদের যথাযথ নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।যাতে তারা ভালো-মন্দ সম্পর্কে নুন্যতম জ্ঞান রাখতে পারে।সবার সম্মেলিত উদ্যোগে একদিন ম্লান হবে কিশোর গ্যাং নামক এমন অভিশপ্ত নামটি।প্রতিটি কিশোর বড় হবে তার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিয়ে।হাটি-হাটি পা-পা করে তারা এগিয়ে যাবে সফলতার পথে।তারা দেখবে,শিখবে,জানবেন,গোটা বিশ্বকে জয় করবে।আসুন আমরা এই কিশোরদের প্রকৃত মানুষ হবার সর্বোচ্চ সুযোগ দিয়ে তাদের দেশের সম্পদে পরিণত করি।তাহলেই গড়ে উঠবে আগামীর সোনার বাংলাদেশ।যে দেশে থাকবে না কিশোর গ্যাং নামক ভয়ালতা।