বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক সহাবস্থান

0
7

মিম্মো পিয়েতানজা:
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের জীবনে ছিলো একটি যুগান্তকারী মুহুর্ত এবং একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণ। তখন সকল জাতি ধর্মবর্ণের মানুষ কাধে কাধ রেখে যুদ্ধ করেছে পাকিস্তানী শাসকের হাত থেকে মুক্ত হতে। বাংলাদেশের মুক্তি ও স্বাধীনতায় সকল ধর্ম ও বর্ণেও মানুষের ভূমিকা আছে। সকল জাতিগোষ্ঠী যার যার নিজ নিজ জায়গা থেকে যুদ্ধ করেছে একই ভাষা বাংলার জন্য। লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য। বাংলাদেশের সকলেই গর্বিত এই মহান এবং সুন্দর অর্জনের জন্য।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই বাংলার মুক্তির জন্য বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী, মানুষের একতা সৃষ্টি ও তরান্বিত হয়। সকলেই তাদের হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে স্বপ্ন দেখে যুদ্ধে নেমেছিলো নতুন একটি দেশ, বসবাসের জন্য একান্ত নিজের দেশের অধিকারী হবে বলে। অন্নান্য দেশও বাংলাদেশের এই মুক্তি সংগ্রামে সাহস ও উৎসাহ যুগিয়ে অবদান রেখেছে যাতে বাংলাদেশ একটি নতুন দেশ হিসাবে যাত্রা শুরু করতে পারে। মায়ের সহায়তায় যেমন একটি শিশু হাঁটা শুরু করে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশও অন্য জাতির সহায়তায় নতুন একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে যাত্রা শুরু করে।

তখন থেকেই বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু করে। এখন মানুষ কাজ করতে পারে, তার বিনিময়ে বেতন পায় এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুন্দর স্বপ্ন দেখতে পারে। এখন নতুন নতুন বড় বড় সুউচ্চ ভবন দেখা যায়। সুন্দর রাস্তাঘাট, শিল্পকারখানা, নতুন স্কুল-কলেজ হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে অগ্রসরমান যদিও পূর্নতা আসেনি এখনো কারণ দেশের প্রতিজন মানুষ যখন ভালো থাকবে, সমাজে সকলেই নিরাপদবোধ করবে তখনই সেটি পূর্নতা পাবে। অর্থনৈতিক পৃথিবীতে ভালোবাসা, মানুষের আবেগ-অনুভুতি, ভালো সম্পর্ক এসবের মূল্য খুবই কম বা নাই বললেই চলে। কিন্তু মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। যদি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় নেতাগণ সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলোর ওপর গুরুত্ব না দেন তবে মানুষের সমস্যা বাড়বে যেটি মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাড়াবে।

মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, মানুষের আবেগ-অনুভুতি, ভালো সম্পর্ক না থাকলে একাকিত্ব, হতাশা এবং শূন্যতা তাকে পেয়ে বসবে। অন্যদিকে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমেরও একটা পরিবর্তন এবং উন্নয়ন দরকার। সেটি না হলে শিশুর বিকাশ হবে না। একটি শিশু শুধু ব্যবসা, বানিজ্যনীতিই শিখবে কিন্তু কোনদিনই তার মানবিক, শৈল্পীক গুণাবলীগুলোর বিকাশ হবে না। তার জীবন হবে বিষাদময় এবং তার পারস্পারিক সম্পর্কেও জায়গাটাও তা নিজের এবং সমাজের অন্যদের জন্য খারাপ ফলাফল নিয়ে আসবে। এর ফলাফল স্বরূপ পুরো সমাজব্যবস্থাও ভেঙে যেতে পারে। একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে সে তার পিতামাতার সাহায্যে, স্কুল-কলেজের শিক্ষায় বেড়ে ওঠে এবং সে মানবিক মূল্যবোধগুলো, পারস্পারিক ভালো সম্পর্কের ব্যাপারে শিক্ষা পায়। কিন্তু পাঠ্যক্রমে যদি এই বিষয়ে কোনকিছু না থাকে বা শিক্ষকগণ শ্রেণীকক্ষে যদি মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে কিছু না বলেন তাহলে তারা কিভাবে শিখবে বা এই বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্বই বা দেবে কিভাবে?

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে শিক্ষা পাঠ্যক্রমে বিষয়টি কিছুটা একপেশে করে রাখা হয়েছে। কিন্তু, ব্যবসায, অর্থনীতি বিভাগগুলোর সাথে সাথে একটি ব্যক্তিমানুষের মানবিক গুণাবলী তৈরীর জন্য মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পারিক ভালো সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে শিক্ষা দেয়া অবশ্যই দরকার। গদ্য, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, সাহিত্যচর্চা শিক্ষার্থীর মানবিক বিকাশে সহায়তা করতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষাদানের পাশাপাশি একজন শিক্ষার্থীর সামাজিক মূল্যবোধ গঠনে কাজ করা উচিত। আগে এটি ছিলো। এই দুই-তিন দশক আগেও এটি ছিলো। ধর্মীয় নেতানেতৃদেরও এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রাখা দরকার আছে বলে আমি মনে করি।

সিলেবাসে ধর্মশিক্ষা বিষয় আছে। কিন্তু সেখানে পাঠ্যক্রম অনুসারে ধর্ম এবং মূল্যবোধ বিষয়ে শিক্ষা দেয়া। কিন্তু আমার মনে হয়, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শিক্ষাকার্যক্রম বিবেচনা করা উচিত। এটি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রীতি ও একতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। অন্যদিকে নেতানেতৃগণ মানুষের জীবন, শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম নিয়ে কথা বললে সেটি পরিবারে, সমাজে এবং দেশে একতা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি করবে। ধনী লোকের প্রচুর খাবার আছে, টাকা আছে তবুও তারা অনেক সময় হতাশাগ্রস্থ। আমরা কৃত্রিম রোবট নই। আমরা নিশ্চয়ই কৃত্রিম রোবট ‘সোফিয়া-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষ’ এর মতন মানুষ না। আমাদের আবেগ, অনুভুতি, বুদ্ধিমত্তা আছে যেটি পশু বা রোবটের নেই। স্কুল, কলেজ কর্তৃপক্ষের অবশ্যই শিক্ষার্থীদের জীবনে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পিতামাতারাও এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্বারা ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারেন। মানুষ যখন অনুভব করে যে সে একা নয় কিন্তু একতাবদ্ধ তখন তারা শান্তিতে থাকে এবং পারস্পারিক সম্পর্কও ভালো থাকে। আমাদের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার যাতে মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে একতা বৃদ্ধি পায় এই দৃষ্টিকোণ থেকে যেটি এখনকার সমাজের একটি প্রয়োজনীয় বিষয়।

অবশ্যই আমরা আমাদের অবস্থান নিচের দিকে যাক সেটি দেখতে চাইনা। এই দেশে ‘রক্ষণাবেক্ষণ এর কাজ’ খুব গুরুত্বপূর্ণ এমনটি কিন্তু নয়। মানুষ কোন জিনিস একদম নষ্ট হয়ে গেলে তারপর সেটি মেরামত করে। সেটি কষ্টকর এবং সেটিতে খরচ বেড়ে যায়। আমাদের দেশের রাস্তাঘাট, ভবন এবং গাড়ি মেরামতেও ঠিক তেমন। যখন কোন রাস্তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় তখন কর্তৃপক্ষ সেটি নতুন করে তৈরী করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু নিয়মিত তদারকি, পর্যবেক্ষণ ও মেরামতের মধ্যে থাকলে নতুন করে তৈরীর খরচ, সময় ও জনভোগান্তি কমানো যায়। ঘরের বেলায়ও তাই। বাড়ির মালিক ঘরের অবস্থা যখন একদম খারাপ তখন সে তার ঘর মেরামতে নামে। কিন্তু প্রতি বছর নিয়ম করে ঘর মেরামত, রং করা বা তদারকি করার কাজে সে হাত দেয় না। সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক সম্প্রীতির জায়গা টিকিয়ে রাখার ব্যাপারেও ঠিক তেমন। সময়মতন, নিয়মিতবাবে তার পরিচর্যা, পর্যবেক্ষণ, সংস্করণ এবং মেরামত না করলে তা ধীরে ধীরে কমে যাবে। এটি বাংলাদেশে হচ্ছে। কারণ মানুষ তার মানবিক মূল্যবোধ হারাচ্ছে মৌলিক এবং প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কি সেটি নিরূপন করতে পারছে না। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা দিনি দিন কমে যাচ্ছে বাড়ছে ঘৃনার সংস্কৃতি। যা সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং এমনকি ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিভক্তি, অস্থিরতা এবং বিভিন্ন গোষ্ঠির মধ্যে বৈষম্য বাড়াচ্ছে। একটি বড় বিপর্যয়ের আগেই আমাদের এই বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। নতুবা খুব দেরী হয়ে যাবে।

* লেখকঃ ইতালীয় নাগরিক ফাদার মিম্মো পিয়েতানজা  একজন কাথলিক ধর্মযাজক। তিনি খুলনাঞ্চলের আন্ত-ধর্মীয় সংলাপ কেন্দ্রের পরিচালক হিসাবে কাজ করছেন।  প্রায় ৪ দশক ধরে বাংলাদেশে আর্তমানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন।