শম্পা দেবনাথ’র গল্প। ||ফেউ ও হরতাল||

0
118

 

হরতাল তিরিশ ফুট ওপরে চড়ে বসে আছে।

সোনামুখী গ্ৰামে এই প্রথম ইলেকট্রিকের পোল বসেছে। ভোট আসছে তো! গাঁয়ের ছেলে , বুড়ো , জোয়ান , বুড়ি, ছুড়ি সবাই সকাল থেকে আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে‌। প্রত্যেকের উর্ধ্বমুখে অবাক দৃষ্টি। চোখটা কপালে উঠেই আছে। যখন ঘরে আসে রান্নাবান্না করতে , তাতে সময় নষ্ট হয় কিছুটা। আলো জ্বলবে গাঁয়ে , ইতিহাসের সাক্ষী হতে কে না চায় ? রান্নাতে সময় নষ্ট। রান্নাও তো কম নয়। খুদ জ্বাল দাও রে, বেশী জল পড়লে অভিমানী খুদের আবার স্বাদ কমে যাবে , তাই মেপে জল দাও, নাড়তে থাক। তাতে এক চিমটি নুন ফেলে দাও। গাছ থেকে তেজপাতা পেড়ে দু -চারটে ছুঁড়ে দাও। আদর করে নাড়তে থাক… একটু মাখো মাখো হলে নামিয়ে নাও। এই মাখো মাখো ব্যাপারটা মাসের দশ তারিখ থেকে কুড়ি তারিখ পর্যন্ত থাকে। প্রথম দশদিন একটু চাল , আটা জোগাড় হয়েই যায়। মাঝখানের দশদিন খুদ। পরের দশদিন মানে মাসের শেষের দিকে মানুষ উদার হয়। হাড়ি ভরে জল দেয়। দার্শনিক হয়ে ওঠে। খুদেরও অভিমান হ্রাস পায়। খুদ বসিয়ে আকাশের দিকে গালে হাত দিয়ে ভাবে।
তবে , শুধু খুদ কি ছানাপোনা দের মুখে রোচে ? তাদের জন্য কতকিছু রাঁধতে হয়। কচু ঘেচু , গেড়ি গুগলি শাক পাতা এনে রসিয়ে বিনা তেলে সেদ্দ করে খুব লংকা দিয়ে কসিয়ে গাছের তেঁতুল দিয়ে মেখে … আহ্ ..সে তো অমৃত। তবে সেও ঐ মাসে দশ-বার দিন। গাঁয়ের জনসংখ্যা তো কম নয়। কচু , গেড়ি আর কত প্রোডাকশন দেবে তাল মিলিয়ে। মূখ্যু-সুক্বু মানুষগুলো নিজেরাও বোঝে। তাই সব নেয় না। বাঁচিয়ে রাখে।

তা এসব কথা থাক। এই ব্যাখ্যান শুনে কার কি জ্ঞান হবে? জানে তো সবাই, রাজা-মহারাজাদেরও জানা আছে সব। সবসময় এত খুঁটিনাটি শুনতে নেই। ভোট এলে মানুষগুলো একটু ভালো থাকে। ফিরে আসি হরতালের কথায়। হরতাল বছর পনেরর কিশোর। যেবার দেশে স্ট্রাইক হয়ে আন্দোলন , মিছিল , মিটিং এ সরগরম, সেবার বেচারাম গিয়েছিল শহরে বাড়ির গাছের কলা বেচতে। হাড় জিরজিরে পাড়ার কুকুর সুন্দরীকে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল অবশ্য বৌকে দেখতে। যেমন যায় সপ্তাহে একবার। তো , সেবার ফেরার ট্রেন মিস করে পরদিন পড়ল হরতালে মানে স্ট্রাইকে। তবে প্রথমটা বেশ ভালোই ছিল। অনেকের সাথে মিছিলে গিয়ে সকালে চারখানা কচুরি আলুরদম সাঁটিয়ে দুপুরের মাংস ভাতের আশায় হাওড়া থেকে পা মিলিয়েছিল দেশোদ্ধারে। লালবাজার পেরোতে না পেরোতেই লাঠির বাড়িতে একেবারে চোখে অনেক দিন না দেখা সর্ষেফুল। বেচারামের বউ তখন সন্তানসম্ভবা। দুদিন নাকি হাসপাতালে ছিল বেচারাম। মাথায় লাঠির বাড়িটা বোধহয় যুতসই জায়গায় পড়েছিল। দুদিনেই খবর হয়ে যায়। খবরের কাগজে নাকি খবর হয়েছিল। সত্যিই গত জন্মের পূণ্যের ফল। কজনের শহরের কাগজে নাম বেরোয় ? খোঁজ নিতে গেছিল বন্ধূ রাজারাম। অত বড় হাসপাতালে এত খাতিরদারির পর টিপসই দিয়ে চলে এসেছিল। হাতে তখন দশ কিলো চাল , ছাতু , বিস্কুট .. কত কি।। মন তো খারাপ ছিলই বন্ধু বেচারামের জন্য। কিন্তু হাড়-হাভাতেদের মন জুড়ে পরদিনের খাই-খাই। কে বলেছিল বেচারাম কে মিছিলে যেতে ? কপাল বলে গরীবদের একটা বস্তুও আছে তো! তাই হল। পেটে থাকতেই ছেলেটা বাপ হারাল। বেচারামের বউ বড় ভালো মানুষ বটে। না খেয়ে ,পেটে বাচ্চা নিয়ে ক’জন-কদিন বাঁচে এভাবে? আবার তার স্বামী শহিদ হয়েছে তিনমাস আগে ! এই খবর পাশের গাঁয়ে ছড়াতেই কোথা থেকে এক বুড়ি পিসি এসে হাজির।রাজারাম পাঁচ কিলো চাল দিয়ে গিয়েছিল যদিও। আর তিন প্যাকেট ছাতু , দুটো বিস্কুট এর প্যাকেট। ওটা নাকি শহর থেকে দিয়েছে শহীদ বেচারামকে। বাকি পাঁচ কিলো বন্ধুর গৌরবের ভাগ হিসেবেই নিজেই নিয়েছে রাজারাম। বেচারামের বৌয়েরও কম গৌরবের কথা নয় তা! তবে ঐ যে , হাভাতাদের পেটে ঘি কবে সহ্য হয়েছে ? দামী চালের ভাত কদিন খেয়ে , স্বামীর শোকে বুক ভাসিয়ে ছেলের মুখ দেখে , কদিন ছেলেকে দুধ খাইয়ে স্বর্গে গেল। বুড়ি ক্ষেন্তি পিসি গেল আটকে। সঙ্গে সুন্দরী।

সেই থেকে ঐ ছেলের নাম ‘ হরতাল ‘। সেই হরতাল ইলেকট্রিকের পোলে চড়ে বসে আছে। আর থাকবে নাই না কেন ? এলাকার জ্ঞানী ব্যক্তি ক্যাপ্টেন মাল … নাম ক্যাপ্টেন.. পদবী মাল… ছয় ক্লাস পড়া মানুষ, সে তো যে সে নয় , এলাকার একমাত্র শিক্ষিত ধনী ব্যক্তি …সবাই তাকে মান্য করে , সে হরতালকে বলেছে ,” আরে ওপরে উঠে দ্যাখ্ , পুরো দেশ দেখতে পাবি। তোর ফেউকে খুঁজে পাবি ঠিক। ”

এই ‘ফেউ ‘ কে ? আসলে ফেউ হল হরতালের ভাই। হরতাল যে কিভাবে বড় হল তা কারো মনে নেই। ঐ বুড়ি ক্ষেন্তিদিদা আর সুন্দরীর মিলিত প্রচেষ্টায় হরতাল বেঁচে গেল। তবে বুদ্ধিটা একটু গোলমেলে হয়ে গেছিল। সব কথাতেই হাসত। খিদে পেলেও হাসত। এলাকার মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে খুশী ছিল হরতাল। কারণ অবশ্য অজানা। হরতালের ছ -সাত বছর বয়সে সুন্দরীর অনেকগুলো বাচ্চা হল। এক বছর পর বাঁচল ঐ ফেউ। গাঁয়ের লোকজন ওকে হরতালের ভাই বলত আর দাঁত বের করে হাসত। হরতালও বুঝে নিল ফেউই ওর ভাই।

সেই ফেউকে গতকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। কাল সারাদিন খুঁজেছে হরতাল। খাওয়াও জোটে নি। শহরে নাকি পাঁঠার মাংসের বদলে কুকুর দিয়ে দিচ্ছে। সবাই কিছুদিন আগে বলছিল। ফেউকে যদি ধরে নিয়ে যায়? অত উঁচু পোল থেকে পুরো গ্ৰামটাই মোটামুটি দেখা যাচ্ছে। সেই সকাল থেকে চড়ে বসে আছে হরতাল। সবাই নামতে বলছে। দুপুর হয়ে গেছে। আজ কোনো ঘরে রান্না হয় নি। বাচ্চাগুলো চ্যাঁ-চ্যাঁ করে কাঁদছে। বুড়ো-বুড়িগুলো ক্যাপ্টেনকে শাপ- শাপান্ত করছে। সেও একটু অপ্রস্তুত। মাল তো একটু মজা করেছিল হরতালের সাথে। কি করে বুঝবে সত্যিই- সত্যিই এমন করবে সে ? ক্যাপ্টেনের চেলা গুলতান , সে আবার চমকাচ্ছে সবাইকে। ” আমাদের বসকে কিছু বললে পোস্ট বসবে না। তুলে নেব। গাঁয়ে আলো আসা বন্ধ হয়ে যাবে, বুঝলে ?”
সেই শুনে এক সরকারী আধিকারিক দিয়েছে এক ধমক । ” এই যে ছোঁড়া , বেশী বকবক না করে ছেলেটাকে নামানোর ব্যবস্থা কর। নাহলে আমাদের ওপরমহলে খবর দিতে হবে। যত্তসব ঝামেলা !”

ক্যাপ্টেনের মা মায়াদেবী বড় ভালো মানুষ। খান একটু বেশী। যা জোটে তাই খান। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে সবে একবাটি মুড়ি নিয়ে বসেছিলেন। খবর পেয়ে তিনিও এসেছেন মুড়ি কৌটোতে ফেরত পাঠিয়ে। সব দেখে শুনে ছেলের ওপর খুব চটেছেন। হরতালকে অনেক ডেকেছেন। নামতে বলেছেন। সে ফেউকে না পেলে নামবে না। মায়াদেবী ছেলে ক্যাপ্টেনকে আদেশ করলেন, ” যেখান থেকে পারো, ফেউকে নিয়ে এস । ”
সেই শুনে ক্যাপ্টেন তার লাল সাইকেলে প্যাডেল মেরেছে। সঙ্গে গুলতান। আশে পাশের গ্ৰামে খুঁজে দেখবে। মায়াদেবী একটিন মুড়ি বাচ্চাগুলোকে ভাগ করে দিয়েছেন। কান্না থেমেছে।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কিছু মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে ইলেকট্রিক পোলের নীচে। পুরো ঘটনা না দেখে বাড়ি যাবে না মনস্থির করেছে। আর গিয়েই বা কি করবে ? কাজ নেই কম্ম নেই। এখানে সবার সাথে থাকলে তবুও খিদে ভুলে থাকতে পারবে।

প্রকৃতি রাতের প্রস্তুতিতে মগ্ন। ঝিঁ ঝিঁ আর ব্যাঙের যুগলবন্দীতে ভরা জোছনা আলো ঢেলেছে। চারিদিক স্পষ্ট দৃশ্যমান। কিছু বুড়ো -বুড়ি ঘরে ফিরে গেছে। দূরে কোথাও কোনো রাতচরা টিইটিই করে প্রহর জানান দেয়। এমন সময় ” পেয়েছিইইই, পেয়েছিইই… করতে করতে …সাইকেলের টিংটিং ঘন্টা বাজাতে বাজাতে নায়ক ও নায়কের স্যাঙাৎএর প্রবেশ। হাতে এক পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা ফেউ। নেতিয়ে গুলতানের কোলে শোয়া।

ঘটনার বিবরণ শোনার জন্য ও হরতালের অবতারণের সাক্ষী থাকার জন্য যারা ঘরে ফিরে গিয়েছিল , আবার কিছু কিছু ফিরে এসেছে। আসর জমে উঠেছে। জানা গেল , ক্যাপ্টেন ফেউকে পাশের গাঁয়ের রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে। কেউ বা কারা জোর পিটিয়েছে। একটা পা ভেঙ্গে দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জেনেছে, ফেউ একটা মুরগী মুখে নিয়ে দৌড় দিয়েছিল। আসলে চুরি করেছিল। তার শাস্তি পেয়ে আর উঠতে পারে নি। ক্যাপ্টেনরা আসার সময় হাতুড়ে কৃপা ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ ও ব্যান্ডেজ লাগিয়ে এনেছে।

হরতালের সে কি খুশী ফেউকে দেখে। পোল থেকে নামার সময় সবাই জোরে জোরে হাততালি দিতে লাগল। যেন কোন বিজয়ী দেশনায়ক যুদ্ধ শেষে বিমান থেকে অবতারণ করলেন। নেমেই সে ফেউকে আদর করতে লাগল।

এই প্রথয় অমৃতের সন্তানের চোখে জল দেখল সোনামুখীর মানুষ। আসলে একমাত্র হরতালই জানে চারদিন না খাওয়া দাদার জন্য ভাই মুরগী চুরি করতে গিয়েছিল।