‘আয়নামহল’ মাসুদ বশীর এর একটি গল্প

0
238

🏐 আয়নামহল (গল্প)

🔥 মাসুদ বশীর

অনন্ত নিলয়ের বাসার প্রধান ফটকের নেমপ্লেটে লেখা রয়েছে- “আয়নামহল”।

চারদিক সুনসান নীরবতা। নিলয় একলা বসে আছেন নিজস্ব রিডিংরুমের এককোণে পড়ার টেবিলে। রাত্রি নিশীথ, মাঝে মাঝে খেঁক শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে, পালা দিয়ে পাড়ার কুকুরগুলোও থেকে থেকে চেঁচিয়ে উঠছে। ঢাকা শহরে শেয়ালের ডাক! কারণটা হচ্ছে তার বাসাটা যে জায়গায় তার পাশ ঘেষেই তুরাগ নদী বয়ে গেছে এবং নদীর আশপাশটায় অনেক গভীর ঝোপঝাড়।

প্রথম জীবনে এখানেই তিনি একটুকরো জমি কিনেছিলেন অনেক কষ্টে উপার্জনের টাকায় এবং তার একমাত্র কন্যাসন্তানের বিয়ের পূর্বে এখানেই করেছেন নিজস্ব দোতলা ছোট্ট বাড়ি, নীচতলাটা ভাড়া দিয়েছেন। এই নিঝুম নিশ্চুপ রাতের নীরবতা ভেঙে দিচ্ছে শেয়াল আর কুকুরের প্রাকৃতিক চিৎকার। এরমাঝে নিলয় কোথায় যেন থেকে থেকে দূরে হারিয়ে যাচ্ছেন। বইয়ের পাতায় চোখ রাখতে রাখতে কখন যে তিনি মনের অজান্তেই হাতে তুলে নিয়েছেন কাগজকলম কে জানে? হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলো। রিডিং লাইটটা নিভে যাওয়াতে ঘরের পরিবেশটা যেন গভীর অন্ধকারে আবিষ্ট হয়ে নিলয়ের মনের গভীরে নিবিড়ভাবে রেখাপাত করতে লাগলো। তিনি ছটফট করতে করতে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন- “না না, তুমি এভাবে আমাকে একা ফেলে চলে যেতে পারো না, কিছুতেই না, আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো, বাঁচি?”
.
অফিস ডেস্কে খবরের স্তুপ। মানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংবাদ তার টেবিলে এডিটিং এর অপেক্ষায়। নিলয় দেশের একটি নামকরা দৈনিকে প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বলা যায় দায়িত্বটা খুবই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ। তার একটি অদেখা কিংবা ভুল সংবাদ প্রকাশ মারাত্মক ক্ষতি করে দিতে পারে দেশের এবং অবশ্যই তার সংবাদপত্রের। কিন্তু ইদানিং তার মনটা সর্বদাই অস্থির অবস্থায় বিচরণ করছে। একটা অস্বাভাবিক বিয়োগব্যথা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। স্বভাবে নিলয় বেশ হাসখোলা টাইপের এবং যথেষ্ট বন্ধু বৎসলও কিন্তু এখন কেমন যেন স্থবির হয়ে গেছেন। এদিকে লেখালেখির স্বভাবটাও তার বাল্যকাল থেকেই। অনন্ত নিলয় একজন স্বনামধন্য কবি। তবে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক- বলা যায় সর্বক্ষেত্রেই তিনি কৃতিত্বের সাক্ষর রেখে চলেছেন, ইতোমধ্যে জাতীয় পুরস্কারও অর্জন করেছেন সাহিত্যকর্মে বিশেষ অবদানের জন্য। এতো অর্জনের পরেও তিনি যেন আজ আয়নামহলে একাকী। নিয়তির নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি বারবার প্রতিবিম্বিত করেই চলছে যেন তার নিজস্ব আয়নামহল।
.
অন্ধকার ঘরে নিলয় একাকী কার সাথে যেন কথা বলেই চলেছেন। কে যেন তাকে থেকে থেকে বলছে- “কবি, অন্ধকারে বসে আছো কেন, আলো জ্বালিয়ে লেখাটা শেষ করো কবি”।
– নিলয় বলছে- কী লিখবো? কার জন্য লিখবো? কেনোই বা লিখবো?
আবারও কে যেন বলছে- “কবি, তুমি আমার জন্য লিখবে, আমাদের জন্য লিখবে, দেশের জন্য লিখবে”।
– আমি যে লিখতে পারছিনা। তুমিতো তখন চাওনি জান, তবে এখন কেন বলছো লিখতে এভাবে? কতরাত তুমি আমাকে বলেছিলে- “এই… রাত অনেক হয়েছে, এখন ওসব রাখো তো, এখন ঘুমিয়ে পড়ো, এসো ঘুমোই”।
হঠাৎ মোবাইলের আলোটা জ্বলে উঠে রিং বেজে উঠলো। বিদেশের কল। আমেরিকা থেকে নিলয়ের মেয়ে মোবাইল করেছে।
– বাবা, তুমি কেমন আছো, কাজের বুয়া ঠিকমতো আসছে তো, ঠিকভাবে ওষুধ খাচ্ছো তো?
– মা, সব ঠিক আছে মা। তুমি-জামাই কেমন আছো মা?
– আমরা ভালো আছি, তোমার জামাইয়ের প্রমোশন হয়েছে, তবে আমেরিকার অবস্থা এখন বিশেষ ভালো না, মানে অভিবাসীদের প্রশাসন ইদানিং খুব সমস্যা সৃষ্টি করছে। তবে, বাবা তুমি টেনশন করো না, আমরা ভালোই আছি। মা, ইন্তেকালেরও তো প্রায় মাস ছয়েক হয়েই গেলো, আগামী সামারে আমরা দেশে আসছি তোমাকেও আমাদের সংগে এখানে নিয়ে আসবো বাবা। তোমাকে এখানে নিয়ে আসার জন্য সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তোমার জামাই সবকিছুই ঠিকঠাক করছে। তুমি টেনশন নিও না বাবা।
– না মা, আমি এই আয়নামহল ছেড়ে তোর মাকে একা ফেলে, আমি কোথাও যাবো না-রে মা।

মোবাইল কলটি নেটওয়ার্ক সমস্যায় হঠাৎই কেটে গেলো। এদিকে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। রিডিং লাইটটা জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। নিলয় আবারো কলম হাতে রিডিংটেবিলে বসে পড়লেন। কিন্তু তিনি ভাবছেন- কী লিখবো আমি? কী করেই বা শেষ করবো এ লেখা? তোমাকে যে লিখে শেষ করা যায়না জান! আয়নামহলে আমি মানেই তো তুমি।
.
নিলয়ের প্রিয়তমা স্ত্রী আয়না’র উজ্জ্বল মায়াভরা মুখটি যেন মূহুর্তের মধ্যে সমস্ত কাগজ জুড়ে চোখের জলে জলছবি হয়ে একমুঠো ঝাপসা আলোয় ভেসে উঠলো….