বুবুসীমা চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা

0
133
বত্রিশের_ধানমন্ডি
বুবুসীমা চট্টোপাধ্যায়, (দমদম, কোলকাতা)।
ধানমন্ডি নামটা ছোটোবেলা থেকে ঠাম্মির কাছে শুনে শুনেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম।
ধানমন্ডি উচ্চারণে ঠাম্মির লালচে চিবুকে
সোনালী আভা ফুটে উঠতো যখন,
আমি তখন লুকিয়ে পড়তে চাইতাম তাঁর মনের কথা।
পারিনি পড়তে, তাই কি পড়া যায়?
সেখানে যে নানা কথাদের ভিড়।
সবুজ পাড়ের সাদা খোলের  শাড়িতে
ঠাম্মি নিজেই আমার কাছে একটা আস্ত সোনার বাংলা।
যেদিন আমাদের তেতলার পূর্ব দিকের ঘরটার
নাম দিলাম আমি ধানমন্ডি,
সেদিন ঠাম্মির দুচোখ বেয়ে যে ধারা নেমেছিল,
সেই ধারাদের নাম দিয়েছিলাম আমি ইছামতি আর সাতক্ষীরা। ঠাম্মি
বলেছিল “বলবো তোমায় একদিন তাঁর কথা-“
সেবার শেষবারের মত বাংলাদেশ থেকে ফিরে এসে ঠাম্মি পূবের ঘরটার এককোনে একটি
সবুজ রঙের টিনের বাক্স রেখে বললেন-
 “বেগম সাহেবা এর নাম দিও স্বাধীনতা!
নাম বড় ভালোবাসা থেকে আসে!”‘
তখন বয়স কম বুঝিনি সেকথার মানে।
দিন গিয়েছে দিনের হাত ধরে,
টিনের বাক্সে লেগেছে জং!
তেতলার ধানমন্ডি তখন
কৈশোর পেরিয়ে সদ্য যৌবন।
সেদিন সতেরোই মার্চ,
বসন্তে আক্রান্ত হয়ে তেতলার ধানমন্ডিতে
আমি তখন ঠাম্মির আঁচলের তলায়-
তীব্র জ্বালা সারা শরীর জুড়ে,
সেই চৈত্রের দুপুরের নিস্তব্ধতাকে
ভেঙে খানখান করে ঠাম্মি শোনালেন
“এক নায়কের কথা,
 জাতির পিতার কথা,
 বাংলার বন্ধুর কথা।
আর শোনালেন-
ধূসর রঙের কেশ, দীর্ঘদেহী অবয়ব,
তীক্ষ্ণ ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি, শান্ত, সৌম্যদর্শন
রাজনীতির কবির দৃপ্ত কণ্ঠের সেই বাণী
” মুক্তির সংগ্রামের পর এবার আমাদের
স্বাধীনতার সংগ্রাম!”
রাজনীতির কবি,স্বাধীনতার স্থপতি,
জাতির জনক মুজিবুর রহমান,
ভেতর-বাইরে তখন ষড়যন্ত্র
বিধ্বস্ত অবকাঠামো,
দরিদ্রতা আর অসহায়তাকে
মাথায় নিয়ে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে লিখেছে যে
সোনার বাংলার নাম
সে শেখ মুজিবুর রহমান!”
মুহূর্তে সারা মন জুড়ে তুফান উঠেছিল সেই নামে-
শান্ত শীতল হয়ে গেছিল রূগ্ন বুকের দহন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নাম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান!
সেই থেকে আমার ভালোবাসার নাম
 ”শেখ মুজিবুর রহমান!’
ঠাম্মি চলে যাওয়ার বহু বছর পর, কর্মস্থল থেকে ফিরে
আমার তেতলার ধানমন্ডিতে গিয়ে দাঁড়াতেই
মনে পড়ল আমি এখন বত্রিশ,
চোখ গেল সেই টিনের সবুজ বাক্সটির দিকে
খুলে দেখি শূন্য আকাশপথের মত একটি
সাদা কাগজে লেখা-
বুঝলে বেগম-
স্বাধীনতার আরেক নাম “মুজিবুর রহমান!”
তোমার জন্ম শতবর্ষে আমার প্রণাম।।