বাংলাদেশে এখনও প্রতিবছর প্রায় ৪০০০ মানুষ কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়

0
304

দেশে  ‘বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস-২০২১’ পালিত 

ঢাকা, ৩১ জানুয়ারী ২০২১ঃ

বাংলাদেশে এখনও প্রতিবছর ৪০০০ লোক নতুন করে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং তাদের মধ্যে শতকরা ৮ ভাগ নারী-পুরুষ প্রতিবন্ধিতাসহ নানান সামাজিক বৈষম্য, অপবাদ ও কুসংস্কারের শিকার হচ্ছে।

প্রতিবছর জানুয়ারী মাসের শেষ রবিবার আন্তর্জাতিকভাবেই বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস পালিত হয়ে আসছে ১৯৫৩ সাল থেকে। এই বছর ৩১ জানুয়ারী ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, কুষ্ঠকে করি জয়’ শ্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে বাংলাদেশে সারা বিশে^র সাথে বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে ‘ বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস-২০২১’।

‘বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস-২০২১’ উপলক্ষ্যে জাতীয় কুষ্ঠ কর্মসূচী এবং লেপ্রোসি এন্ড টিবি কোঅর্ডিনেটিং কমিটি যৌথভাবে ঢাকার মহাখালীস্থ জাতীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চত্ত্বরে সকাল ১০টায় স্ট্যান্ডিং র‌্যালী ও একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে।

কুষ্ঠরোগ একটি অতি পাচীন রোগ কিন্তু বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে এখনও পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে ৬০০ জন ব্যক্তি কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং চিকিৎসা শুরু করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘২০৩০ সালের মধ্যে শূন্য কুষ্ঠ উদ্যোগ’ কে সামনে রেখেই মূলত সকল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।  প্রধানমন্ত্রী ২০১৯ সালে এ বিষয়ক জাতীয় সম্মেলনে বলেছিলেন ‘আমরা যদি আন্তরিকভাবে কাজ করি, তাহলে ২০৩০ সালের অনেক আগেই কুষ্ঠমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হব।”

কুষ্ঠরোগীদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন ‘‘তারা আমাদের সমাজেরই অংশ। তাদের দূরে ঠেলে দেয়া সঠিক নয়। কোনো ব্যক্তির দেহে কুষ্ঠ রোগ শনাক্ত হলে আপনাদেরকে সহানুভূতির সঙ্গে আচরণ করতে হবে এবং তিনি যাতে সুস্থ হয়ে ওঠেন, সেজন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এটি খুবই জরুরি।”

বাংলাদেশে বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস-২০২১ উদযাপন
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস-২০২১ উপলক্ষ্যে রবিবার সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহাখালী, ঢাকা, প্রাঙ্গন থেকে বর্নাঢ্য স্ট্যান্ডিং র‌্যালী এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

ডঃ সামিউল ইসলাম, পরিচালক, এমবিডিসি, এবং লাইন ডিরেক্টর-টিবিএল এন্ড এএসপি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, র‌্যালীটি উদ্বোধন করেন। ডাঃ এনামুল হক, উপ-পরিচালক, এমবিডিসি এবং প্রোগ্রাম ম্যানেজার, জাতীয় কুষ্ঠ কর্মসূচি (এনএলপি); ডাঃ মোঃ শেখ আব্দুল্লাহ হাদি, সাবেক প্রোগ্রাম ম্যানেজার, জাতীয় কুষ্ঠ কর্মসূচি; এনএলপি এসএমও ডঃ আদনান রাসেল এবং ডঃ নাইমা হক; এলটিসিসি চেয়ারম্যান এবং টিএলএমআই-বি এর কান্ট্রি ডিরেক্টর মি সলোমন সুমন হালদারসহ এনএলপি ও এলটিসিসি এর কর্মকর্তা ও কর্মীবৃন্দ, এবং সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে এলটিসিসি স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক এবং ডেমিয়েন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের পরিচালক ডাঃ অং কা জাই মগ; লেপরা বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডাঃ ডেভিড পাহান; টিএলএমআই-বি এর প্রোগ্রাম সাডোর্ট কোঅর্ডিনেটর জিপ্তাহ বৈরাগী এবং এইপি প্রোজেক্ট ম্যানেজার মাসুমা পারভিন; ডেমিয়েন ফাউন্ডেশনের মেডিকেল কো-অর্ডিনেটর ডাঃ দিপক কুমার বিশ্বাস; হিড বাংলাদেশের ফিনান্স ডিরেক্টর মি নিখিল চন্দ্র সাহা; সালভেশসন আর্মির প্রোজেক্ট ম্যানেজার মিঃ আলবার্ট সরকার; হিড বাংলাদেশের প্রোজেক্ট ম্যানেজার মি থমাস সিংহসহ গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

রাজধানীর এই অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় সিভিল সার্জন অফিস এবং কুষ্ঠ রোগসেবা প্রদানকারী বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিশ^ কুষ্ঠ দিবস-২০২১ উপলক্ষ্যে বর্নাঢ্য আয়োজন করে।

বাংলাদেশে কুষ্ঠ রোগের চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে কুষ্ঠ আক্রান্ত রোগীর হার প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে একজনের নিচে নামিয়ে আনা। বাংলাদেশ সেই লক্ষমাত্রা অর্জন করেছে ১৯৯৮ সালে। কিন্তু তার পরেও ২০১৯ সালে সারাদেশে ৩৬৩৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ২০১৮ সালে নতুন রোগী সনাক্ত হয়েছেন ৩৭২৯ জন এবং ২০১৭ সালে সে সংখ্যা ছিলো ৩৭৫৪ জন।

সর্বশেষ করোনা মহামারীর মধ্যেও ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসে নতুন রোগী সনাক্ত হয়েছে ৮৯৮ জন। ২০২০ সালের সম্পূর্ণ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। জাতীয় কুষ্ঠ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে এখনো প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪০০০ মানুষ নতুন করে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হিসাবে সনাক্ত হয়।

কুষ্ঠ রোগ কিভাবে হয়, এই রোগের লক্ষন কি?
কুষ্ঠ একটি জীবানু ঘটিত মৃদু সংক্রামক রোগ যা ‘মাইকোব্যাক্টেরিয়াম লেপ্রি’ দিয়ে হয়। এই রোগে প্রান্তিক স্নায়ু আক্রান্ত হয়। বেশীরভাগই চামড়ার মাধ্যমে এই রোগের বর্হিপ্রকাশ ঘটে। চামড়ায় ফ্যাকাশে, লালচে অথবা তামাটে অনুভূতিহীন বা কম অনুভূতির দাগ। হাত বা পায়ে ঝিনঝিন অনুভূতি বা অনুভূতিহীনতা দুর্বলতা, ব্যথাযুক্ত  স্নায়ু, মুখমন্ডল বা কানের লতি ফোলা বা চামড়া পুরু হওয়া এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম।

সবচাইতে আশার বিষয় হলো শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষের শরীরেই প্রাকৃতিক ভাবেই কুষ্ঠরোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে। তবে কুষ্ঠরোগ প্রতিরোধে কার্যকর টিকা/ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কার হয় নাই। এই রোগের চিকিৎসায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৮২ সালে (মাল্টি ড্রাগ থেরাপি-MDT) ব্যবহারের সুপারিশ করে যে পদ্ধতিতে বাংলাদেশে কুষ্ঠরোগীদের চিকিৎসা দেয়া শুরু করে ১৯৮৫ সালে।

কুষ্ঠ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন রোগগুলোর একটি হলেও বাংলাদেশে এখনও এই রোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা নেই বললেই চলে। অন্যদিকে আক্রান্ত রোগী সময়মত চিকিৎসা না পেয়ে এখানে শতকরা ৮ ভাগ নারী-পুরুষ প্রতিবন্ধিতা এবং সামাজিক বৈষম্য, অপবাদ ও কুসংস্কারের শিকার হয়।

বাংলাদেশে কুষ্ঠ রোগের সেবা কোথায় পাবেন?
বাংলাদেশে কুষ্ঠরোগের ঔষধ বিনামূল্যে দেয়া হয়। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন করে টিএলসিএ (টিবি এন্ড লেপ্রসি কনট্রোল এসিস্ট্যান্ট) আছেন। তিনি মূলত মাঠ পর্যায়ের সরকারি পর্যায়ে কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। একজন ডাক্তার কোন মানুষের শরীরে কুষ্ঠ আছে বলে নিশ্চিত করলে টিএলসিএ তার নিবন্ধন সম্পন্ন করেন ও এমডিটি চিকিৎসা দেয়া শুরু করেন। সুষ্ঠরোগের সকল সরকারি সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয় বাংলাদেশে জাতীয় কুষ্ঠ কর্মসূচির আওতায়।

সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বেসরকারিভাবে দি লেপ্রসী মিশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিএলএমআই-বি), ডেমিয়েন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, লেপ্রা, হীড বাংলাদেশ, ল্যাম্ব, চন্দ্রঘোনা খ্রীষ্টান হাসপাতাল, ধানজুড়ী কুষ্ঠ কেন্দ্র, দিনাজপুর, আরডিআরএস বাংলাদেশ, এবং সালভেশন আর্মি বাংলাদেশে অত্যন্ত ফলপ্রসুভাবে কুষ্ঠ রোগীদের সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।

কুষ্ঠ রোগীদের সকলপ্রকার চিকিৎসায় তথা কুষ্ঠজনিত জটিলতার চিকিৎসায় নীলফামারীতে টিএলএমআই-বি এর বিশেষায়িত হাসপাতাল বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিতকরণে দি লেপ্রোসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ পরিচালিত এই হাসপাতালের চিকিৎসকগণ, সেবিকারা কাজ করে যাচ্ছে নিরলসভাবে।

কুষ্ঠ বিশেষজ্ঞদের মতামত
দি লেপ্রসী মিশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিএলএমআই-বি) এর প্রোগ্রাম সাপোর্ট কোঅর্ডিনেটর জিপ্তা বৈরাগী বলেন ‘‘কুষ্ঠকে আসলে ভয় করলে চলবে না। সময়মত চিকিৎসা নিলে কুষ্ঠরোগ আক্রান্ত ব্যক্তি পুরোপুরি সুস্থ্য হয়। এব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজন আছে। ’

জিপ্তাহ বৈরাগী আরো বলেন, ‘‘বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলো তথা সকল জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে কুষ্ঠ জটিলতার চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যেই একটি কুষ্ঠমুক্ত দেশ হবে।”

টিএলএমআই-বি এর এইপি প্রজেক্ট ম্যানেজার মাসুমা পারভীন বলেন, ‘‘কুষ্ঠরোগীদের সামাজিক বৈষম্য, অপবাদ ও কুসংস্কারের হাত থেকে রক্ষায় বাংলাদেশের গণমাধ্যম বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।”

কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রাথমিক পর্যায়েই সনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ কুষ্ঠমুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন মাসুমা পারভীন।

কুষ্ঠরোগের চিকিৎসার ইতিহাস
১৮৭৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত মানুষ ভাবতো কুষ্ঠরোগ সৃষ্টিকর্তার অভিশাপ। তখন পর্যন্তও এই রোগে কেউ আক্রান্ত হলে লোকালয় থেকে রোগীকে নির্বাসন দেওয়াই ছিল একমাত্র উপায়। কিন্তু ১৮৭৩ সাল থেকে ১৯৬০ সালে নরওয়ের বিখ্যাত বিজ্ঞানী ডাঃ আরমার হ্যানসেন কর্তৃক ১৮৭৩ সালে কুষ্ঠ জীবাণু আবিষ্কার করে। সেজন্য ডাঃ হ্যানসেনের নামানুসারে এই রোগকে সেজন্য হ্যানসেন রোগও বলা হয়।

১৯৬০ সালে সালে মার্কিন বৈজ্ঞানিক জন শেফার্ড সীমিতভাবে কুষ্ঠ জীবাণুর বংশ বিস্তারের পদ্ধতি আবিষ্কার করে। ১৯৮২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক মাল্টি-ড্রাগ থেরাপি (গউঞ) অনুমোদিত হয়। এই ঔষধ বাংলাদেশে কুষ্ঠরোগীদে বিনামূল্যে সরবারহ করা হয়।

কুষ্ঠমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মানে করণীয়
সঠিক সময়ে রোগী চিহ্নিতকরনঃ কুষ্ঠরোগে সংক্রমিত হওয়ার পর অনেক বছর লেগে যায় এর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেতে। প্রতিক্রিয়া প্রকাশের সাথে সাথে অর্থাৎ সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে রোগী পুরোপুরি সুস্থ্য হয় এবং প্রতিবন্ধিতার হাত থেকে রক্ষা পায়।

কুসংস্কার দূরীকরণঃ সময়মতন চিকিৎসায় কুষ্ঠ সম্পূর্ণরূপে ভালো হয়। কিন্তু এই রোগ নিয়ে এখনও সমাজে নানান কুসংস্কার বিদ্যমান। অনেকসময় রোগীরা কুষ্ঠ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলেও লুকিয়ে রাখে। কুসংস্কার দূরীকরণে সামাজিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি অতীব জরুরী।

হাসপাতালের সেবা নিশ্চিতকরণঃ বাংলাদেশের জেলা, উপজেলার সরকারি হাসপাতালে কুষ্ঠরোগ জনিত জটিলতার চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরী। সরকারের দেয়া বিনামূল্যের ঔষধ সকল সরকারি হাসপাতালে থাকাটা জরুরী। ডাক্তারগণ যাতে সহজেই কুষ্ঠরোগ শনাক্ত করতে পারেন সেজন্য তাদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা জরুরী।

প্রকল্পে বাজেটঃ জাতীয় কুষ্ঠ কর্মসূচি’র বার্ষিক বাজেটের পরিমান খুবই সামান্য। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেসানুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এই বাজেটের পরিমান বাড়াতে হবে।