ফিরে দেখা ভরন্তযৌবনা আজিরন বেওয়া

0
260

ফিরে দেখা…
ভরন্ত যৌবনা আজিরন বেওয়াঃ স্বপ্নিল বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি

আবদুল জলিলঃ
আজিরণ বেওয়ার অনেক সংস্করণ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বিশেষ করে এবারের সদ্য সমাপ্ত বই মেলায় এই উপন্যাসটির সবগুলো কপি শেষ হওয়াই প্রমাণ করে এটি কোন মাপের উপন্যাস। এর ঔপন্যাসিক রাশেদ রেহমান আমার করা বইটি সম্পর্কিত সমালোচনাকে নিজের করে নিয়ে তাতে যে প্রাণস্পন্দন এনেছেন .. মনে হচ্ছে ভরন্ত যৌবনা যমুনা চরের আজিরণ এখন সারা বাংলার প্রেমিক পুরুষের আরাধ্য নারী। তার জীবন-যাপনের নানা পরতে পরতে যে অসংখ্য বাঁকের সৃষ্টি হয়েছে তার ভাঁজে ভাঁজে কেবলই শিল্পের সুন্দর ছোঁয়া দৃশ্যমান। আর তাতে করেই পরিচালকের চোখ আটকে গেছে এর কাহিনী বিন্যাসে। হচ্ছে চলচ্চিত্র। …. সাধুবাদ তরুণ তুর্কী রাশেদ রেহমানকে…

ব্যক্তিগত জীবন ভাবনা, শৈশব-কৈশোরের দুন্তপনা, যুগযুগ ধরে চলে আসা চরাঞ্চলবাসির গভির জীবনবোধ, সুখ-দুঃখ, প্রচলিত গ্রাম্য রেওয়াজ, নানা সংস্কার, আর জীবন-জীবিকার সরল বর্ণনার এক প্রাণবন্ত রচনা আজিরন বেওয়া।
গ্রামীণ সমাজের নানামুখি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন কর্মপন্থা আর সেই অনুযায়ী গড়ে ওঠা সমাজের মানুষের নানা সরল চিন্তা-চেতনা ও কলহ-কুটিলতা, জৈবিক চাহিদার গ্রাম্য নগ্নরূপ যেমন আছে তেমনি বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামরত মানুষের বৈত্র্যিময় পেশা ও জীবনধারণের চিত্রও ফুটে উঠেছে।
সেইসাথে মানুষের বিচিত্রমুখি জীবনাচারণের পথে অমোঘ সত্যের কাছে সমর্পিত একটি পরিবারের দুর্দশা যা আরও শতগুণে বাড়িয়ে দেয় ভাঙন-তান্ডব। করে গৃহহীন, সহায়হীন, কাঙাল। নামায় পথে, শেখায় জীবনের মোড়ে মোড়ে ঘুরে ফিরে জীবনকে এগিয়ে নেবার মন্ত্র। সৃষ্টির সেই আদিকাল থেকে চরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবনবোধ, সংস্কৃতি, লোকাচার, বিশেষ রীতি-রেওয়াজ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের বর্ণনা যেমন আছে তেমনি প্রাকৃতিক চিকিৎসা, অপ্রচলিত খেলাধুলা, নতুন চর দখলের বিশেষ কায়দা কানুন, গ্রাম্য সালিশি বৈঠক, জীবিকার জন্যে সিলেট কাবার, খিয়ার, পাথারে যাবার বর্ণনা উপন্যসটির অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও স্বকীয়তা দিয়েছে মাদার বাঁশ খেলা, কুটুম পাখির ডাক, পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ডিম বিক্রি, দরিদ্র মানুষের জীবনের পরম সত্য কান্দাইল দিয়ে ভাত-খিচুড়ি রান্নার সরল চিত্রময়ী বর্ণনা উপন্যাসটির কঠিন-কঠোর বাস্তবতা আর গ্রহণযোগ্যতাকে করেছে সার্বজনীন।

খন্ড খন্ড ভিন্নতর চিত্রময়ী বর্ণনায় সাদাসিধে শব্দের ব্যবহারের ‘আজিরন বেওয়া’ উপন্যাসটির রচয়িতা চর গবেষক লেখক রাশেদ রেহমান। একজন উদীয়মান ঔপন্যাসিকের পাশাপাশি তিনি একজন কবি ও সম্পাদক। নিজে চরের বাসিন্দা। জন্ম, শৈশব, কৈশোর, পড়ালেখা সবই তার চরে। চরের আবহমান ধরে চলে আসা রীতি-নীতি, লোকাচার আর উত্তাল যমুনার ভাঙন-তান্ডবের সাথে তার গভির মিতালি। তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন কিভাবে সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ নিঃস্ব হয়ে পথে বসে, কিভাবে কোমকের ফলে ঝরে পড়ে অসংখ্য তাজা প্রাণ, কিভাবে সংসারের চাকা চরের তপ্ত বালিকণায় আটকে জীবনকে নানামাত্রিকতায় নিয়ে চলে। একমুঠো ভাতের জন্যে সংগ্রাম যে কত নির্মম তার সুন্দর বর্ণনা তিনি তুলে ধরেছেন।

কিভাবে চরের সৃষ্ঠি হলো, যমুনার উৎপত্তি আর সেই যমুনার চরের অন্যতম চর চল্লিশপাড়া সৃষ্টির বর্ণনা দিয়েছেন। চল্লিশপাড়া সম্পর্কে লেখক লিখেছেন,‘ শুধু নামেই চল্লিশ পাড়া নয়, ছোট-বড় মোট চল্লিশটি পাড়া বা মহল্লা আছে বিধায় নাম তার চল্লিশপাড়া। এরপর এই গ্রামের কোন কোন জাতি ধর্ম ও পেশার লোক বাস করে তাদের বর্ণনা রয়েছে। এই অধ্যায়ের আবেদনময়ী ও তথ্য নির্ভর বর্ণনা রয়েছে চাকরদের সম্পর্কে। তিনি দেখিয়েছেন এই একবিংশ শতাব্দির স্যাটেলাইটের যুগেও চরের মানুষ কিভাবে এখন সমাজপতি, ধনকুবেরদের বাড়িতে জীবিকার তাগিদে গোলামি করে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ইচ্ছে করলেও সে যেতে পারেনা কোথাও। তিনি লিখেছেন ‘ কেউবা পিতার জন্যে একটা চাদর, খাওয়া ও নিজের জামা কাপড়ের বিনিময়েও চাকর খাটতো। … ্ঈদের দিনেও চাকররা ছুটি পেত না। … এ যেন অসহায়দের প্রতি নিদারুণ উপহাস! ’
তুলে ধরা হয়েছে দারিদ্র্যপীড়িত সমাজের আরেক অভিশাপ বাল্য বিয়ের প্রসঙ্গ। এখনও দেশের নানা নদীর জেগে ওঠা চরের মানুষের মাঝে বাল্যবিয়ের প্রবণতা অনেক বেশি লক্ষ্যণীয়।
জাতিসংঘের এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটে দক্ষিণ এশিয়ায়। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাল্য বিয়ের হার বেশি বাংলাদেশে। বাংলাদেশের মধ্যে এই হার বেশি রাজশাহী বিভাগে। আর এই বিভাগের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার বেশি সিরাজগঞ্জ জেলায়। এই জেলার উপজেলার মধ্যে বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি কাজিপুর উপজেলায়। তাহলে কি দাঁড়াল।
পৃথিবীতে বাল্যবিয়ে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে কাজিপুর উপজেলায়। আর কাজিপুরের মধ্যে চরাঞ্চলের মানুষের মাঝে এই হার বাড়াবাড়ি রকমের বেশি। আজিরন বেওয়ায় লেখক বিষয়টি তুলে ধরেছেন স্বয়ং আজিরনকে বাল্যবিয়ে দিয়ে। আজিরণের সাথে বছির মিয়ার বাল্য বিয়ের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- ‘পুতুলের বিয়ে বিয়ে খেলার ঘোর কাটতে না কাটতেই পুতুল বিয়ের মতই বিয়ে হয়ে যায় অল্পবয়সী আজিরনের।’
আজিরন-বছিরের দাম্পত্য জীবনের অকৃত্রিম ভালোবাসা, সুখী গৃহকোণে জীবন-যুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াবার প্রয়াস, আজিনরে কোলজুড়ে সন্তানের জন্ম, তার বেড়ে ওঠার কথা দ্বিতীয় অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে। আছে জ্যৈষ্ঠমাসের মাদারবাঁশ ওঠা, তার কারণে আজিনের ফুফুর মাদার ধরা, মাদার ধরা ফুফুর সাথে চেলা হিসেবে আজিনের নাচার কাহিনী। নানামাত্রিক মাদারের নাম সে সাথে মাদার ভুতেধরাদের একটি গান-
‘ হায় মাদারের খেলাগো
খেলমুইতো আমরাগো
আইসেন আইসেন আইসেন গো
কালু মাদার আইসেন গো?
আমার ঘরে ওকি হায়গো।’
রয়েছে কাজিপুরের অধুনালুপ্ত ‘পুশুরা মেলা’র কথা, সাধারন একটি বাঁশ কিভাবে মাদারবাঁশে পরিণত হয় তার বর্ণনা। আছে চরাঞ্চলের মানুষের থাকার জন্যে চরে জন্মান কাইশা ও গমের ডাটার দ্বারা বিশেষভাবে তৈরি ঘরের কথা। নানাজাতের মাছের নাম ও তা ধরার নানা উপায়ের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।

লেখক পুরোপুরি বছির-আজিরনের সংসার যাপন, সমাজের মানুষের কলহ-কূটিলতা, সহযোগিতা, যমুনার তীব্র ভাঙনতান্ডব, জেগে ওঠা চর দখলের বিশেষ লড়াই স্থানীয় ভাষায় যাকে ‘কোমক’ বলে তার বর্ণনা। প্রতিবছর রোগে-শোকে যত না লোক মারা যেত তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এই কোমকে মারা যেত। দেখিয়েছেন কিভাবে সমাজপতিরা নি¤œবিত্ত মানুষদের ঠকায় সেই সমাজের গ্রাম্য মাতব্বরগণ নিরীহ, দিনমজুরদের সব সময় ঠকাত। পাঁচ হাজার টাকার গরু মাতব্বর তিন হাজার টাকায় আজিরনের কাছ থেকে নিয়ে যায়।

আরেকটি বিষয় এখানে লক্ষ্যনীয়, এখন প্রায় লুপ্ত হয়ে যাওয়া অনেক গ্রাম্য খেলার বিবরণ দিয়েছেন লেখক। যেমন গোল্লাচি, বউচি, দাড়িয়াবান্ধা. বদন, হাডুডু, কাবাড়ি, নড়িগুটি, নই নই। এইসব খেলাতো আর চোখেই পড়েনা। এমনকি এই নামগুলোও বর্তমানের ছেলেমেয়েরা ভুলে যেতে বসেছে।
চরাঞ্চলে যেসব শাক পাওয়া যায় , যা চরাঞ্চলবাসি সবাই কমবেশি খায় বথুয়ার শাক, তার সাথে কাতিকলাই, সরিষাপাতা, শোলক পাতা, ধনিয়াপাতা, মিষ্টি আলু, লাউ, মসুর, বুট, বাদাম, কাউন এসব ফসলের বর্ণনা পড়ে মনে হয় ফিরে যাই সেই সুবর্ণ-সোনালী কাজিপুরের চরে।

সেসময়ের চরের মানুষের বিনোদনের জন্যে জনপ্রিয় ছিল রেডিও ও টেপরেকর্ডার যাকে চরবাসি ‘ক্যাসেট’ বলতো। আজিরন তার অনেক কষ্টের লালন করা গরু বিক্রির টাকায় বছির মিয়াকে রেডিও কিনে দেয়। আবার শ্বশুরবাড়িতে গেলে সেখানে ‘ক্যাসেট এনে বিভিন্ন নামের কাহিনীর ক্যাসেট শোনানোর ব্যবস্থা করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য- লেখক এখানে কাজিপুর শুধু নয় আশপাশের বেশকটি উপজেলায় একনামে পরিচিতি পাওয়া বিখ্যাত পালাকার বাউল শাহ হাসান আলী চিশতি এবং আলহাজ্ব বাউল নবীর হোসেনের গাওয়া পালাগানের কথা উল্লেখ করে যথার্থতার পরিচয় দিয়েছেন।
চরাঞ্চলের মানুষ অধিক অতিথিপরায়ণ এবং ধর্মের প্রতি অনুগত। কাজিপুরের চরের লক্ষাধিক মানুষ মুর্শিদ ভক্ত। তারা নানা পীরের অনুসারী এবং নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি মিলেমিশে করতো যা লেখকের চোখ এড়ায়নি। এখানে কোনদিনও ধর্মের বাড়াবাড়িতে মারামারি কিংবা খুন খারাবির ঘটনা ঘটে না। অথচ এখন এটা জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

আজিরন বেওয়া উপন্যাসের গাঁথুনিতে একটা উপকাহিনী এসে পুরো উপন্যাসের গতি প্রকৃতি যেন নতুন করে তুলে ধরেছে। আর পাঠক পেয়েছে চরাঞ্চলবাসির জীবন-যাপনের আরেকটি দিকের পরিচয়। লেখক তুলে ধরেছেন সমাজের নিষিদ্ধ একটি প্রেমের পথচলার কথা। গ্রামে গ্রামে ঘুরে এক বিশেষভাবে নির্মিত ঝুড়িতে ডিম কিনে নিয়ে এসে তা আবার মহাজনের নিকট বেশি দামে বিক্রির একটি সুন্দর উপস্থাপনা আমাদের মুগ্ধ করে। লেখকের ভাষায়‘ সে (মানিক) পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ডিম কিনে সরিষাবাড়ি মোকামে গিয়ে বিক্রি করতো।’ এই মানিকের বউয়ের নাম সুফিয়া। ভরন্ত যৌবনা এক অষ্টাদশী।

সমাজের আদিম নেশায় মেতে মানিকেরই বেড়ে ওঠার অবলম্বন ছিল যারা তাদেরই মাদ্রাসাপড়–য়া সন্তান সাইফুলের লালসার শিকার হয় সুফিয়া। আজিরনের জিম্মায় রেখে বছির মিয়ার সাথে মানিক গেছে খিয়ারে। আর রাতের গভিরে সাইফুল তার প্রেমিকার জন্যে লেখা চিঠি আজিরনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাকে বাইরে পাঠিয়ে দেয়। এসময় মানিকের ঘুমন্ত স্ত্রীর ভরা যৌবন দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারে ন সে। হিং¯্র ধাবায় সুফিয়ার যৌবন গাঙে নৌকা ভাসায়। সুফিয়ার কোন বাধা তাকে রুখতে পারে না। শুধু একবার নয়, এখান থেকেই শুরু হয় আদিম প্রেমলীলা। পরিণতিতে সুফিয়াও তার সুডোল যৌবনের একচ্ছত্র অধিকার সাইফুলের হাতে তুলে দেয়। দিনের পর দিন আজিরনের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে প্রেমলীলা। একপর্যায়ে দুজন ঘর ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়। এসব ঘটনা গ্রামীণ সমাজের একটা করুণ বাস্তব সত্য।

পরকীয়ায় মত্ত সুফিয়ার আর স্বামী সোহাগ ভালো লাগে না। খিয়ার থেকে ফিরে মানিক রাতে তার স্ত্রীর কাছ থেকে কিছুই পায়না। কিন্তু সরল বিশ্বাসী মানিকের পক্ষে কি করে বোঝা সম্ভব তার আদরের সোনাবউ অন্যের যৌবনগাঙে ঢেউ তুলছে। মানিককে কামলার জন্যে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েও সাইফুল সুফিয়ার কাছে যায়। ফিরে এসে মানিক হাবভাবে সব বুঝতে পারে। কিন্তু মুখ ফুটে সেকথা সুফিয়াকে বলতে পারে না। কারণ তখনও যে মনিবপুত্র সাইফুল এবং স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাসের পারদ তার কমে নাই। তবে মনের মধ্যে সন্দেহের রেখাটা বারবার নাড়াচাড়া দিয়ে ওঠে। মামী আজিরনের সাথে রাতের ঘটনা নিয়ে সে কথা বলে। আজিরন তাকে ভরসা দেয়। সেই ভরসাতেই বছির মিয়ার সাথে দুইমাসের জন্যে সিলেট কাবারে যায়। লেখক এখানে গ্রাম্য মানুষের বিশ্বাসকে তুলে ধরেছেন। তাদের নিকট যে বিশ্বাসটাই একমাত্র সম্বল। আর গরিবের কথা তো কেউ সহজে মেনেও নেয় না।

পৌষ মাসের কর্করা ভাত সকালের সোনা রোদে পিঠ লাগিয়ে বসে যারা মরিচ, রসুনপাতা, ধইনাপাতা আর খাটি সরিষার তেল মেখে যারা খেয়েছেন কেবল তারাই জানেন এর মজাটা কি। কর্করা ভাত মানে রাতের খাবারের পরে রেখে দেয়া বাসিভাত। লেখক নিজেও চরের বাসিন্দা হওয়ায় নিজের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ এই বর্ণনা সত্যিই হৃদয়গ্রাহী।

এরপর লেখক দেখিয়েছেন বাংলাদশের গ্রামের মানুষের আচার বিচারের প্রধান কর্তা হন যার বেশ টাকাকড়ি ও জমিজিরাত আছে: আছে পেশিশক্তি, লাঠিয়াল বাহিনী তারাই। তাদের কথাই চরের মানুষের শেষ কথা। মিথ্যে চোরের অপবাদে আজিরনের ছেলে আজিবারকে গ্রাম্য মাতব্বরগণ যে শাস্তি দিয়েছে তা অমানবিক। পত্রিকার পাতা ওল্টালেই এখনও আজিবারের মতো জুতোর মালা, অথবা গাছের সঙ্গে বেধে মারপিটের ঘটনা চোখে পড়ে। দুর্বল আজিরনদের কিইবা করার আছে। চোখের জলেই তাদের সমস্ত প্রতিবাদ ঝরে পড়ে। আর অপমান সইতে না পেরে আজিবার ফাঁসিতে ঝুলে জীবন দেয়। এখনও লেখকের বর্ণিত আজিরনদের কান্না কি থেমেছে? আজিবারেরা কি এখনও জীবন দিচ্ছে না।

প্রেম মানেনা কোন জাতি কূলমান, ধনি-দরিদ্র ভেদাভেদ। এই প্রেম যেমন গড়তে পারে অনেক কিছু তেমনি অনেক কিছুই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সন্তানশোকে পাগলপ্রায় আজিরন বেওয়ার দুর্বল সময়ে সুফিয়া সাইফুলের হাত ধরে অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। একেতো সন্তানের মৃত্যুশোক তার উপর সংসারের অনটনের মাঝে মানিকের কাছে দেয়া কথা রাখতে না পারার যন্ত্রয়ায় একেবারে ভেঙ্গে পড়ে আজিরন। এরই মধ্যে যখন ঘাটে সিলেট কাবারের নৌকা আসে এবং রেওয়াজ অনুযায়ী কোন ধ্বনি ওঠে না সে নৌকা থেকে তখন চিন্তার রেখা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে আজিরনের কপালে। অজানা এক চিন্তায় তার মন অস্থির হয়ে ওঠে। সবাই নৌকাঘাটে এগিয়ে যায়। যেতে পারেনা আজিরন। তার মন যে অস্থির। লেখকের ভাষায়-‘ অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে আজিরন।’

অবশেষে তার ভাবনাই সত্যি হয় মানিকের কথায়-‘ মামা সিলেটে ডায়েরিয়ায় মারা গেছে। তাই হাওড়েই মাটি দেয়া হয়েছে। ’ তরুণ লেখক নিজ বয়সকে ছাপিয়ে লেখায় কতটা পরিণত উপন্যাসের এই শেষটাই তার পরিচয় তুলে ধরেছে। সমস্ত আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে মানিককে দিয়ে অমোঘ সত্যটি তিনি বলিয়েছেন অতি সহজে।

পৃুণশ্চঃ আমার গত লেখায় বলেছিলাম‘ কোন চলচ্চিত্রকার এটিকে নিয়ে ছবি বানালেও অবাক হবো না। সত্যিই হয়েছে…… এটি এখন ছবি হচ্ছে……

#

আবদুল জলিল, কাজীপুর, সিরাজগঞ্জ
২/৩/১৮