ফাদার টিমকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলো বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ

0
221


স্টাফ রিপোর্টার :
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুর্নঃগঠন, বিভিন্ন দুর্যোগে দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের পাশে দাড়ানো তথা দেশের সনামধন্য নটরডেম কলেজের ষষ্ঠ অধ্যক্ষ ফাদার টিমকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করে ঢাকার মালিবাগে কারিতাস বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে নাগরিক স্মরণ সভা।

ফাদার টিমকে স্মরণ করে অনুভূতি প্রকাশ করেন বাংলাদেশের খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা কার্ডিনাল, আর্চবিশপ প্যাট্রিক ডি’রোজারিও, সিএসসিসহ অন্যান্য অতিথিবর্গ।

কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’রোজারিও বলেন, “ফাদার টিম বেঁচে আছেন। তিনি অমর তাঁর চিন্তায়, তাঁর কথায়, তাঁর কাজে।”

মাননীয় সংসদ সদস্য ও নির্বাহী পরিচালক, প্রিপ ট্রাস্ট মিজ্ আরমা দত্ত বলেন, “ফাদার টিম ছিলেন আমাদের উন্নয়নধারার প্রবর্তক। উনি ছিলেন বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার স্রষ্টা।”

এ মহতি অনুষ্ঠানের সমাপনী লগ্নে কারিতাস বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বিশপ জের্ভাস রোজারিও উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে গিয়ে বলেন, “ফাদার টিম বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি রচনা করেছেন। নিঃস্বার্থভাবে তিনি সেবা করেছেন গ্রামে-গঞ্জে জনপদে।”

এছাড়া এডাব সভাপতি জয়ন্ত অধিকারী, প্রধান সমন্বয়কারী, নিজেরা করি, মিস্্ খুশি কবীর, আইপিডিএস সভাপতি সঞ্জিব দ্রং, ডঃ বেনেডিক্ট আলো ডি’ রোজারিও, নটর ডেম কলেজের উপাচার্য ডঃ রেভাঃ ফাঃ প্যাট্রিক গাফনি, সিএসসি স্মৃতিচরণ ও অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ফাদার টিম-এর বর্ণ্যাঢ্য কর্মময় জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।

কারিতাস বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা ডঃ রেভাঃ ফাঃ হিউবার্ট লিটন গমেজ এর প্রার্থনা এবং নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন ফ্রান্সিস রোজারিও স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হয় স্মরণ সভা।

উল্লেখ্য ফাদার টিম এই বছরের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখে আমেরিকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম গ্রহণ করেও ভোগ-বিলাসিতা ত্যাগ করে বাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তারে ও আর্ত মানবতার সেবায় ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন মানবতাবদী এই ব্যক্তিত্ব। নটর ডেম কলেজের ষষ্ঠ অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কলেজটির অন্যতম এই প্রতিষ্ঠাতা।

ফাদার টিমের হাতে ধরেই কলেজটিতে বিজ্ঞান বিভাগ চালু হয় এবং ১৯৫৫ সালে তিনি নটর ডেম কলেজ সায়েন্স ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া কলেজটির ডিবেটিং ক্লাব ও নটর ডেম কলেজ অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবেরও প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

একাধারে একজন শিক্ষাবিদ, প্রাণিবিদ এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের সক্রিয় কর্মী, বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা এবং একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরিতে কাজ করা বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু।

উল্লেখ্য, ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রলংকরী ঘূণিঝড় এবং ১৯৭১-এ স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমাদের দেশের অতুলনীয় ক্ষতি সাধিত হয় এই সময় ত্রান ও পুনর্বাসনের জন্য তিনি নিজেকে পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছিলেন।

১৯৭১ থেকে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে ছয় মাসের জন্য ফাদার টিম মনপুরা দ্বীপে ঘুর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন প্রকল্পের পরিচালকের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে International Understanding ও বাংলাদেশের উন্নয়নে দীর্ঘ ৩৫ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য ফাদার টিম ম্যাগসায়সায় পুরস্কারে ভূষিত হন। একই বছর সমাজ সেবায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করায় তিনি আবু সাইয়ীদ চৌধুরী পুরস্কারে ভূষিত হন।

তিনি বাংলাদেশের মানবাধিকার কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পর পর তিনবার এর সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে তিনি South Asian Forum for Human Rights প্রতিষ্ঠা করেন ও আহ্বায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ২০০০ থেকে ২০১১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ফাদার টিম বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার ও উন্নয়ন, দরিদ্র ও শারীরিক প্রতিবন্ধী মহিলাদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করেন। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি কারিতাস বাংলাদেশের পরামর্শক নিয়োজিত হন।

২০০৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে ভাটিকান পন্টিফিকাল কাউন্সিল ন্যায় ও শান্তি, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট লেখক, প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, এবং মানবাধিকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার জন্য বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার তাকে “স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু” হিসেবে পুরস্কৃত করেন।