প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে কৃষিতে অবদান রাখছেন প্রতিবন্ধী কৃষক: তথ্যমন্ত্রী

0
271

বাংলাদেশে ৮৬% প্রতিবন্ধী মানুষ প্রত্যক্ষভাবে কৃষিতে জড়িত

শহিদুল ইসলাম নীরব: কৃষিতে বাংলাদেশের শতকরা ৮৬ জন শারীরিক ও কুষ্ঠ প্রতিবন্ধী মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং করোনা মহামরীর এই দুঃসময়ে বাংলাদেশের ৮৮ শতাংশ প্রতিবন্ধী মানুষের আয় কমে গেছে অন্যদিকে পারিবারিক ব্যয় সংকোচনের জন্য লকডাউনের সময় ২২ শতাংশ প্রতিবন্ধী মানুষ তাদের কন্যা সন্তানের বিয়ে দিয়েছেন।

‘বাংলাদেশে কৃষিতে প্রতিবন্ধী মানুষের ভূমিকা’ এবং ‘প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন-জীবিকায় কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব’ সম্পর্কিত দুইটি পৃথক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

শনিবার (১৯ ডিসেম্বর ২০২০) ঢাকাস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দি লেপ্রসী মিশন ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ, ইকো-কোঅপারেশন, নরেক এবং বাংলাদেশ কৃষক লীগ আয়োজিত দুইটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন ও সাংবাদিক সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষক লীগের সভাপতি মিঃ সমীর চন্দ, সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. উম্মে কুলসুম স্মৃতি, এমপি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর পরিচালক (মাঠ সেবা শাখা) জনাব মাহফুজ হোসেন মৃধা, ইকো-কোঅপারেশন এর হেড অব প্রোগ্রামস্ জনাব মোঃ আবুল কালাম আজাদ এবং দি লেপসী মিশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মি. সলোমন সুমন হালদার।

প্রধান অতিথি তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ বলেন, ‘‘প্রতিবন্ধী কৃষকেরা শারিরীক প্রতিবন্ধীতা জয় করে কৃষিতে অবদান রাখছে সেটি অবশ্যই অনুকরণীয়। যারা প্রতিবন্ধী হয়েও কষ্টসাধ্য কৃষি কাজের সাথে যুক্ত আছেন তাদেরকে আমি ধন্যবাদ জানাই।’’

তথ্যমন্ত্রী আরো বলেন, গত পাঁচ দশকে জনসংখ্যা আড়াইগুন হয়েছে। প্রতি বছর ২ লক্ষ একর কৃষি জমি কমেছে। কিন্তু এরসাথে কৃষি উৎপাদনও বেড়েছে। আর এটি সম্ভবপর হয়েছে বর্তমান সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে। কৃষি জমি যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নগরকৃষি এবং ছাদ কৃষির ওপরও জোড় দিতে হবে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে আগে প্রতিবন্ধীদের লুকিয়ে রাখা হতো। কিন্তু এখন বাবা-মা তাদের প্রতিবন্ধী সন্তানদের শিক্ষিত করে এবং তাদেরকে কিভাবে সাবলম্বী করা যায় সেটি ভাবছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্যকন্যা সায়মা ওয়াজেদ জয় এর বিশেষ উদ্যোগে প্রতিবন্ধীদের জন্য নানান কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। তারা বিভিন্নখাতে ভাতা পাচ্ছেন, বিভিন্ন জায়গায় তারা পুরস্কার পাচ্ছেন।

পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন ‘‘সকলে সমাজের পিছিয়েপড়া মানুষদের নিয়ে কথা বলে না। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে যেসকল সাংবাদিক ভাইবোনেরা রিপোর্ট করেছেন তাদেরকে অভিনন্দন জানাই।”

কৃষিতে প্রতিবন্ধী মানুষের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করার জন্য লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ তিনি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ কৃষক লীগের সভাপতি মিঃ সমীর চন্দ বলেন “কৃষকলীগ যেহেতু কৃষকদেরই সংগঠন, এখানে প্রতিবন্ধী কৃষকগণও যেন অর্ন্তভুক্তি হয় সেব্যাপারে আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। আগামী বছর সফল প্রতিবন্ধী কৃষকদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করবো এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।”

কৃষিতে প্রতিবন্ধী মানুষের অবদান নিয়ে সংবাদ করায় ৯ জন সাংবাদিক পুরস্কৃত দি লেপ্রসী মিশন ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ কৃষিতে প্রতিবন্ধীদের ভূমিকা ও অবদান নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করার জন্য ৯ জন সাংবাদিককে পুরস্কৃত করেছে।

কৃষিতে প্রতিবন্ধী মানুষের অবদান নিয়ে সংবাদ করায় ৯ জন সাংবাদিক পুরস্কৃত
দি লেপ্রসী মিশন ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ কৃষিতে প্রতিবন্ধীদের ভূমিকা ও অবদান নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করার জন্য ৯ জন সাংবাদিককে পুরস্কৃত করেছে। তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন।

পুরস্কারপ্রাপ্ত টেলিভিশন সাংবাদিকবৃন্দঃ চ্যানেল-২৪ এর প্রতিবেদক হাসনাত রাব্বী প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রতিবেদক আফরিন জাহান এবং ডিবিসি টেলিভিশনের প্রতিবেদক তাহসিনা সাদিক যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন। যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক রামিজ আহসান এবং জিটিভি’র প্রতিবেদক ফেরদৌস আরেফিন যৌথভাবে তৃতীয়স্থান অধিকার করেছেন।

পুরস্কারপ্রাপ্ত সংবাদপত্র সাংবাদিকগণঃ আমাদের সময় পত্রিকার প্রতিবেদক এম এইচ রবিন প্রথম। দেশ রুপান্তরের প্রতিবেদক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনের নিজামুল হক বিপুল যৌথভাবে দ্বিতীয় হয়েছেন। তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন ভোরের কাগজের ডুমুরিয়া, খুলনা প্রতিনিধি শেখ মাহতাব হোসেন। এছাড়া বিজয় বাংলাদেশ এর সাতক্ষীরা প্রতিনিধি মীর খায়রুল আলম এবং ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক রতন মালোকে বিশেষ পুরস্কার প্রদান করা হয়।

টিএলএমআই-বি পরিচালিত দুইটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানের প্রোগ্রাম সাপোর্ট কোঅর্ডিনেটর জিপ্তা বৈরাগী এবং টিএলএমআই-বি এর গবেষণা পরামর্শক জেমস সুজিত মালো। গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত।

গবেষণায় পরামর্শক হিসাবে ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজকল্যান ইনস্টিটিউট এর অধ্যাপক ড. সাহানা নাসরিন এবং ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের সহকারি অধ্যাপক এ্যাশলে কমা রায়।

বাংলাদেশে ৮৬% প্রতিবন্ধী মানুষ প্রত্যক্ষভাবে কৃষিতে জড়িত
‘বাংলাদেশে কৃষিতে প্রতিবন্ধী মানুষের ভূমিকা’ বিষয়ক গবেষণায় উঠে এসেছে কৃষিতে বাংলাদেশের শতকরা ৮৬ জন শারীরিক ও কুষ্ঠ প্রতিবন্ধী মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

বাংলাদেশের ৮ বিভাগের ১৬ টি জেলার ২১০ জন শারিরীকভাবে প্রতিবন্ধী মানুষ গবেষণায় অংশগ্রহণ করেন যাদের মধ্যে ৪২ শতাংশই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী সদস্য।

গবেষণায় উঠে এসেছে ৬২ শতাংশ প্রতিবন্ধী মানুষ মুরগী পালন করেন, ৫২% গবাদিপশু পালন করেন, ৩৬% শাকসবজি চাষ করেন এবং ৩৭ % প্রতিবন্ধী মানুষ জমিতে চাষাবাদ করেন।

দি লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে মাত্র ১২.৮৬% প্রতিবন্ধী মানুষ সরকার স্বীকৃত কৃষক বাকি বাকি ৮৭.১৪ শতাংশ প্রতিবন্ধী মানুষ কৃষির সাথে যুক্ত হয়েও সরকারি কৃষি সেবা থেকে বঞ্চিত।

এছাড়া মাত্র ৪ শতাংশ প্রতিবন্ধী কৃষক ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ে কৃষিভিত্তিক কমিটির সাথে যুক্ত বাকি ৯৬ শতাংশ প্রতিবন্ধী কৃষক কোন কমিটির সাথে যুক্ত নয়। তাছাড়া মাত্র ১৩.৪০ প্রতিবন্ধী কৃষক সরকার প্রদত্ত সেবাসমূহ পায় বাকি ৮৬.৬০ শতাংশ সরকারি সেবা পায় না।

২৪ শতাংশ প্রতিবন্ধী কৃষক বলেছেন কৃষি-বান্ধব যন্ত্রপাতির অভাবে তাদের কৃষিকাজে সমস্যা হয়। ৩১% প্রতিবন্ধী কৃষক বলেছেন তাদের কৃষি লোন পেতে সমস্যা হয়, কৃষিমূলধনের সমস্যার কথা বলেছেন ৩২% কৃষক।

গবেষণায় একটি প্রশ্নের উত্তরে প্রতিবন্ধী কৃষকদের মধ্যে ৬৭ শতাংশই বলেছেন তাদের মূলধন সহায়তা প্রয়োজন, ৫৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী কৃষক বলেছেন সরকারি কৃষিনীতিতে তাদের যেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কোভিড-১৯ মহামারীকালীন ৮৮% প্রতিবন্ধী কৃষকের আয় কমেছে
‘প্রতিবন্ধী কৃষকের জীবনে কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব’ বিষয়ক গবেষণায় উঠে এসেছে মহামারীকালী বাংলাদেশে ৮৮ শতাংশ প্রতিবন্ধী কৃষকের আয় কমেছে। তাদের মধ্যে ৮১ শতাংশ চিকিৎসা পায়নি। এছাড়া গবেষণায় উঠেছে এসেছে ২২ শতাংশ প্রতিবন্ধী কৃষক পরিবারের খরচ কমাতে তাদের কন্যা সন্তানের বিয়ে দিয়েছেন।

অন্যদিকে ৬৫.১৪ শতাংশ প্রতিবন্ধী কৃষক লকডাউনের সময় তাদের কাজের ক্ষেত্র হারিয়েছেন এবং ৩৬ শতাংশ প্রতিবন্ধী কৃষক বাধ্য হয়ে কম মজুরিতে কাজ করেছেন।

গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনা করে গবেষকগণ পরামর্শ দিয়েছেন– কৃষিনীতি সহসা পরিবর্তন করা না গেলেও জরুরিভিত্তিতে প্রতিবন্ধী কৃষকদের জন্য প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সরকার প্রদত্ত বিদ্যমান সরকারি কৃষিসুবিধাসমুহ যেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিবন্ধী কৃষকদের জন্য সরবারহ করা হয়।

তাছাড়া মহামারির এই দুঃসময়ে, রাষ্ট্র এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠিকে সরকারি ভর্তুকির আওতায় আনলে প্রতিবন্ধী কৃষকগণ উপকৃত হবেন এবং তাদের কৃষিবিত্তক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারবেন।

বীজ, সার, প্রশিক্ষন, কৃষি লোন, কৃষিপন্য বিক্রয়ে সহায়তা, কৃষিযন্ত্রপাতিতে ভর্তুকিসহ নানান সুবিধাসমূহ যেন প্রতিবন্ধী কৃষকও পায় জরুরি ভিত্তিতে সেই ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।