পদ্মা নদী থেকে বালু তুলছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা

0
237


ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি:
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদী থেকে দিনের পর দিন অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন যুবলীগের এক নেতাসহ কয়েকজন ব্যক্তি।

বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুসারে, সেতু, রাস্তাঘাট, মহাসড়ক, বন ও বাঁধসহ গুরুত্বপূর্ণ কোন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলনের অনুমতি নেই।

তবে আইনটিকে অমান্য করে মিলন চৌধুরী নামে এক যুবলীগ নেতা নিয়ন্ত্রণ করছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কর্মকান্ড। তিনি স্থানীয় যুবলীগের আগের কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে কোনো কমিটিতে নেই, তবে এলাকায় তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঈশ্বরদীর সাঁড়া ইউনিয়নের পাথরঘাট, সাঁড়া ঝাউদিয়া, সাঁড়া পশ্চিম থেকে লালপুর উপজেলার চর মহাদিয়ার, জর্জিয়া ও ভেড়ামারা থানার চর গোলাপনগর এবং চরদিয়ার বাহাদুরপুর পর্যন্ত কমপক্ষে ৪০টি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন চলছে। বালু তোলার পর ট্রাক্টর ও শ্যালো ইঞ্জিন চালিত ভটভটি বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিটি স্থানেই বাঁধের ১০০-১৫০ মিটারের মধ্য থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তবে এসব ড্রেজারে লস্কর, মাস্টার ও সুকানি ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও পদ্মা নদীর তীর, আশপাশের ফসলি জমি ও সাড়া মহাশ্মশাণ দখল করে বালুর ব্যবসা করা হচ্ছে।

বালু উত্তোলনের সময় রংধনু নামের একটি ড্রেজারের লস্কর খাজা ইউনুস খান, ব্যবস্থাপক মিরাজ ও গজারিয়া নামের ড্রেজারের মাস্টার আলেকের সঙ্গে। তারা বলেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ভাগ দিয়ে তাঁরা বালু উত্তোলন করছেন। একটি ড্রেজার দিয়ে প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ ঘনফুট বালু তোলা যায়। এই বালু বিক্রির টাকার ৫০-৭০ শতাংশ নেতাদের দিতে হয়। তবে তারা এসব নেতার নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাঁড়া ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের কয়েকজন স্থায়ী বাসিন্দা জানান, বালু দস্যুরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তাদের বাধা দেওয়ার সাহস করছেন না। তারপরও তারা বালু উত্তোলনে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তারা তা না মেনে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে নদীর গভীর থেকে বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছেন।

স্থানীয় লোকজন বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে বালু তোলা হচ্ছে। প্রতিদিন ৫০টি গাড়ি লোড করে উত্তোলনকৃত বালু বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিটি গাড়িতে ১০০ ঘনফুট বালু পরিবহণ করা যায়।

সাঁড়া গ্রামের বাসিন্দা আজাদ মিয়া বলেন, এক সপ্তাহ ধরে তার ১০ শতাংশ জমি থেকে আওয়ামী লীগের নেতার লোকজন বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছেন। বাধা দেওয়ায় ওই নেতার পক্ষেই কয়েকদিন আগে ঈশ্বরদী থানার পুলিশ এখানে আসে। পরে পুলিশের উপস্থিতিতেই অবৈধভাবে তার জমি থেকে বালু নিয়ে যাওয়া হয়।

এ বিষয়ে ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফিরোজ কবির বলেন, ‘বালু উত্তোলন প্রক্রিয়ার সঙ্গে পুলিশের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে কোনো পুলিশ সদস্য এর সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পাবনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী কেএম জহুরুল হক বলেন, ‘বিষয়টি উপজেলা প্রশাসক বন্ধ করতে পারেন। তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সাঁড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এমদাদুল হক রানা সরদার বলেন, ‘সাঁড়া ভাঙন কবলিত ইউনিয়ন। ভাঙন প্রতিরোধ ও তীর সংরক্ষণের জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। অথচ নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে সাঁড়া এখন হুমকির মুখে। তিনি বলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ থেকে রক্ষায় এবং কৃষি জমি বাঁচিয়ে জমির মালিকদের কৃষি চাষের জন্য প্রশাসনের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

ঈশ্বরদী সহকারী কমিশনার (ভূমি) মমতাজ মহল জানান, ‘সাড়া ইউনিয়নের ইসলামপুরে বালু নিলামে দেয়া হয়েছে। অন্যস্থানগুলোর বিষয়ে আমি কিছু জানিনা। আমার কাছে এ ধরণের কোন অভিযোগ আসেনি। তারপরও খোঁজ নিয়ে অভিযোগ প্রমানিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

বালু উত্তোলনে প্রশাসনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করছেন জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘বালু উত্তোলন বন্ধে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে সব ধরনের ‘প্রভাবমুক্ত’ থেকে কাজ করা হচ্ছে।’

অভিযোগের এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিলন চৌধুরীর সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেয়া যায়নি।