জলঢাকায় লেবু বাগান করে সফলতার দিশারী মনিষা বেগম

0
256

আসফি বিনতে আসাদ (নীলফামারী) প্রতিনিধিঃ বিয়ের পর শ্বশুরের দেওয়া সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে থাই লেবু বাগান করে এলাকায় সারা ফেলেছেন মনিষা বেগম। দিনদিন তার সফলতার পরিচিতি বিস্তৃতি পাচ্ছে। এমনকি প্রায়দিন বিভিন্ন এলাকার মানুষ সরেজমিন দেখতে আসছেন সন্তানসম মমতায় গড়ে তোলা মনিষার থাই লেবু বাগান।
মনিষা বেগম,স্বামী শাহাবুদ্দিন হোসেন সবুজ। বাড়ী নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বালাগ্রাম ইউনিয়নের আরাজী দেশিবাই গ্রামে।তিনি ২০১৪সালে এইচ এস সি পাশ করেছেন। ওই গ্রামেই প্রায় ৫বছর আগে তার বিয়ে হয়। তাদের ঘরে তিন বছরের একটি ছেলে সন্তান আছে।
মনিষা জানায়, ‘নারীরাও পারে উন্নয়ন করতে, সুযোগ দিলে তারাও পারে অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে।’ এই মানষিকতায় বিয়ের পর আমাকে সাড়ে পাঁচ বিঘা জমি দেন আমার শ্বশুর মোজাম্মেল হক। এসব জমি শুকনো মৌসুমে পতিত থাকতো। এক সময় ভাবতে থাকি, এই জমি হতে কিভাবে লাভবান কিছু উৎপাদন করা যায়। একদিন আমার স্বামীসহ সিদ্ধান্ত করে ফেলি লেবু বাগান করব। এনিয়ে স্থানীয় কৃষি অফিসের সাথে যোগাযোগ করলে তারা আমাদেরকে উৎসাহিত করেন। বর্তমানে আমাদের বাগানে পনের’শ লেবু গাছ আছে। সর্বশেষ গত মৌসুমে বাগানটি পরিচর্যা ও কীটনাশক প্রয়োগসহ বাজারজাত করতে আমাদের মোট ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এবং তিন লাখ ৮০হাজার টাকার লেবু বিক্রি করেছি।
লাভজনকের কারণে বাগানটি করতে আমার শ্বশুরও আমাকে উৎসাহ যুগিয়েছেন। বাগানে ফেব্রæয়ারী-মার্চ মাসে গাছে ফুল আসে। এসময় আগাছা পরিস্কার করতে হয়। ফুল আসলে সার হিসেবে,শুকনা গোবর,খড়ের গুড়া ও স্প্রে করতে হয়। যাতে ফুল না ঝরে যায়। শুকনা মৌসুমে ডিসেম্বর হতে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেচ দিতে হয়।ফল তোলার ভরা মৌসুম মে-জুন ও জুলাই মাস। আমি নিয়মিত কৃষি অফিসের প্রতিনিধির নিকট বাগানের বিষয়ে পরামর্শ নিয়ে থাকি।
মনিষা বেগমের স্বামী শাহাবুদ্দিন হোসেন সবুজ বলেন, বিয়ের পর মেয়েরা আরাম-আয়েসে থাকতে পছন্দ করলেও মনিষা তার ব্যতিক্রম। অলসতা তার শত্রু। অহেতুক গল্প,আড্ডা তার নিকট বিরক্তিকর। সে সকাল-বিকাল বাগানে নিয়োজিত শ্রমিকদের সাথে নিজেও যখন পরিচর্যার কাজ করে সেসময় আমাকে ভাল লাগে। আরও ভাল লাগে বাগান হতে লেবু সংগ্রহ করে যখন পাইকারদের নিকট দেওয়া হয়।
লেবু বাগানে পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত রুপিয়া বেগম ও মোসলেমা বলেন, আমরা বাগানে দৈনিক তিনজন শ্রমিক কাজ করি। ফল তোলার মৌসুমে আরও পাঁচজন শ্রমিক নিয়ে প্রতিদিন কাজ করতে হয়। ফলের মৌসুমে লেবুর মিষ্টি হাওয়ায় শুধু বাড়ী নয় ,ছড়িয়ে যায় গোটা পাড়ায়। তাজা লেবুর মিষ্টি নির্মল হাওয়ায় এলাকার পরিবেশটাই যেন বদলে যায়। সে অনুভুতি ভাষায় বলে বুঝানো যাবেনা। সেসময় বিভিন্ন এলাকার লোকজন বাগানটি দেখতে আসে । তারা বাড়ী ফিরবার সময় অনেকে বাগান হতে লেবু কিনে নিয়ে থাকেন।
এলাকায় কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নার্গিস বেগম বলেন, বাগানটিতে কখন কি রকম পরিচর্যার দরকার হয় তার পরামর্শ আমি মনিষা বেগমের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে দিয়ে থাকি। মৌসুম ছাড়াও সারা বছরে বাগানটি হতে ফল তোলা যায়। এছাড়া একজন নারীর এই ব্যতিক্রম উদ্যোগে আমার স্যারেরাও খোঁজখবর রাখেন।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা পূরবী রায় বলেন, সরকার নারী উন্নয়নের জন্য অবিরত কাজ করছে। থাই লেবু বাগান করে মনিষা নামে এক গৃহবধু এলাকায় চমক সৃষ্টি করেছে। তাকে দেখে নারীরা এমন ফল কিংবা সবজি বাগান করলে আরও অর্থনীতিতে নারীর অবদান বৃদ্ধি পাবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহ্ মোহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন,এ বাগানের বিশেষত্ব সারা বছরই ফল পাওয়া যায়।এই এলাকার মাটি অম্লীয় হওয়ার কারণে লেবু চাষের উপযোগী। তার লেবু বাগান দেখে অনেকেই বাগান করতে আগ্রহী হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহবুব হাসান বলেন,নারী উন্নয়নের জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তর কাজ করছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে একজন নারীর বাগানে উৎপাদিত থাই লেবু। যা মানবদেহে বিভিন্ন ভিটামিনের চাহিদা পূরনে ভ’মিকা রাখছে। নারীরা কৃষিক্ষেত্রে এভাবে অবদান রাখলে দেশের অর্থনীতির চাকা আরো মজবুত হবে। তাই এলাকার নারীদের বিভিন্ন বাগান করতে এগিয়ে আসা উচিত।