কাজী জহির ছবিও আঁকছেন

0
260


–মাইন উদ্দিন আহমেদ
ছবি আঁকার বিষয়টি আধুনিক সভ্য জগত অনেক উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন একটি কাজ বলে বিবেচনা করে। শিল্পীকে অনেক সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয়। উন্নত দেশগুলোতে চিত্রশিল্পীর কদর বেশি এবং মুদ্রামানে অবস্হান অনেক উঁচুতে।
আঁকিবুকির মধ্য দিয়ে আঁকাআঁকির দিকে এগিয়ে যাবার একটা সম্ভাবনা সব সময় থেকেই যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষেত্রে আমরা তার নমুনা দেখেছি। তবে অঙ্কনশিল্প বা আর্ট আঁকিবুকি-নির্ভর বিষয় কিন্তু নয়। এই ক্ষেত্রটা বিশাল একটি ব্যাপার। হাজার-লক্ষ বছর আগের অংকন চিহ্ন পাহাড়ের গায়ে বা পাথরের উপর আবিস্কৃত হয়েছে। তবে আর্ট আগে না কি আর্টের প্রশিক্ষণ আগে এ প্রশ্নের উত্তরে সাধারন মানুষও বলতে পারবে যে, আর্ট আগে। আগে মানুষ এঁকে ফেলে আর বিশ্লেষণ হয় পরে।
আঁকাআঁকির সাথে বকাবকিরও একটা সম্পর্ক হয়ে যায় যদি কাজটি কোন স্কুলছাত্র বা ছাত্রী হোমওয়ার্ক করতে বসে শুরু করে দেয়। কিন্তু আমাদের আজকের লেখার বিষয়বস্তু যিনি তিনি হলেন পঞ্চাশোর্ধ এক ভদ্রলোক। ইনিও নিজের অন্যান্য কাজ করতে বসে আঁকাআঁকি শুরু করেছেন বছর দুয়েক হলো। বয়সের কারনে আমরা ওনাকে বকাবকি শুরু করতে পারিনি।
এই ভদ্রলোক কাজ করেন জাতিসংঘের নিউ ইয়র্ক অফিসে। লেখালেখি করেন তাও আবার সাধারন লেখকের মতো নয়, অন্যরকম করে। তা কেমন? তিনি লেখেন পদ্য, গদ্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমন কাহিনী, আত্মজীবনী, রন্ধন কাহিনী, স্মৃতিকথা, কথোপকথন ইত্যাদি ইত্যাদি। এরই মধ্যে লিখে ফেলেছেন সত্তুরটা বই। বুঝে নিন অবস্হাটা।
এই আর্টিস্টকে বুঝবার জন্য আমরা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। সৌবাগ্যবশতঃ সুযোগ এসে গেলো। একটা পারিবারিক দাওয়াত প্রাপ্তির বদৌলতে অভিনন্দিত হয়ে ঢুকে গেলাম ওনার নিজস্ব পরিসরে, তাঁর বাসস্হানে।
বইপুস্তকের প্রাচূর্যের মধ্যে একটা আর্ট কর্ণারও পেলাম ওনার নিউ ইয়র্কের বাসায়। ওনার আঁকা অনেকগুলো ছবিও দেখলাম। প্রবণতা দেখলাম ছোটছোট ছবি আঁকার দিকে। ছবিগুলো আমার খুবই ভালো লাগলো। আমি কিছু ছবি আলাদা করে ভদ্রলোকের সম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরন চিহ্ন হিসেবে সেলফোনে ছবিও তুলে নিলাম।
ওখানে বসেই ভাবতে থাকলাম, ছবি আঁকার পেছনে মানুষের কি কারন থাকতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে আমার মাথায় উত্তর হিসেবে তিনটা কারন উদিত হলো। শিল্পীদের সান্নিধ্য, প্রকৃতির প্রভাব এবং অন্তর্নহিত মেধা। তিনি বললেন, ছেলেবেলায় ওনার এক সহপাঠি ছবি আঁকতো যেটা ওনার খুবই ভালো লাগতো। তিনি আঁকছেন আর বলছেন, অংকনের ব্যাপারটা ওনার অন্যান্য লেখার প্রবাহ ব্যহত করছে। আমি মন্তব্য করলাম, জনাব, এটাওতো এক ধরনের লেখা, রঙের রেখা। তিনি মুচকি হাসলেন। ছবিগুলো আমার ভালো লাগার কারনে এই শিল্পীকে ছবি আঁকা না ছাড়ার জন্য অনুরোধ করলাম। উত্তরে তিনি হাঁ-না কিছুই বললেননা। তবে এটা জানালেন যে, এক্রিলিক কালারের চেয়ে জলরঙে ছবি ফোটে ভালো।
জলরঙের এই প্রশংসার সাথে এর বেয়াড়া কর্মকান্ডের জন্য তিরস্কারও করলেন। বললেন, ওয়াটার কালারে ছবি দারুণ ফুটে উঠে কিন্তু রঙটি নিয়ন্ত্রণ মানতে চায়না, ছড়িয়ে পড়ে।
জানতে চাইলাম, ওয়াটার কালার কি আপনার মনের রঙের চেয়েও বেশি বেয়াড়া? তিনি মুচকি হাসলেন, উত্তর দিলেননা।
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক, আমরা এই শিল্পীর নাম এখনো ঘোষনা করিনি। নাম না বলে আর কোন রাস্তা আছেকি?
একটু আভাস দেই। এই ভদ্রলোক অনেক রকম লেখা লেখেন, এ কথা আগেই বলেছি। আরেকটি তথ্য দিই। ইনি বাংলায় ক্রিয়াপদহীন কবিতা লিখেছিলেন অনেকগুলো। সেগুলো ‘ক্রিয়াপদহীন ক্রিয়াকলাপ’ নামক একটা বই আকারে প্রকাশিতও হয়েছিলো। এটি ওনার সত্তুরটি বইয়ের একটি। এই বইটি আবার ভারতে উড়িয়া ভাষায় অনুবাদও হয়েছে।
ভদ্রলোক বাংলাদেশের মানুষ। অনেকে এরই মধ্যে এই ছবিয়ালকে হয়তো চিনে ফেলেছেন। ইনি বলেন, ওনার মাথায় কবিতা আসার প্রক্রিয়াটি হচ্ছে ‘কবুয়ত’, তবে আমরা জানতে চাইনি অংকনের ক্ষেত্রে ছবির ধারনা আসার ক্ষেত্রে ‘ছবুয়ত’ জাতীয় কোন প্রক্রিয়া কাজ করে কিনা।
যা-ই হোক, এই ভদ্রলোকের নাম হচ্ছে কাজী জহিরুল ইসলাম। আমাদের অনুরোধ থাকবে এই মর্মে যে, কাজী জহির সাহেব, ছবি যখন একবার আপনার হাতে ধরা দিয়েছে তখন ওটা ছাড়বেননা, চালিয়ে যান। শিল্প ব’লে কথা! আপনার বহুমুখী প্রতিভার জগতে ছবিও থাকুক কবির সাথে। আমাদের শুভেচ্ছা রইলো।
***