কাজিপুরে ঘানিভাঙ্গা তেল এখন আর দেখা যায় না

0
149


টি এম কামাল : তেলবীজ থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদনে নিয়োজিত পেশাজীবী কলু স¤প্রদায়। ‘কলু’ শব্দটি দেশজ। কলু শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘তৈল ব্যবসায়ী’। তেলের সঙ্গেই এদের সম্পর্ক। কলুরা ঘানিতে সরিষা, তিসি, সয়াবিন, সূর্যমুখী, ভেন্না, শুকনো নারিকেল ও মান্দার তুলাবীচি ইত্যাদি ভাঙ্গিয়ে অর্থাৎ পিষে তেল নিষ্কাশন করত। কলুরা ওই তেল বিক্রয় করত। কলুদের প্রধানকে বলে পরামানিক। ব্যাপারী ও চৌধুরী হলো ওদের পদবি। সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে এবং দেশের অন্যান্য স্থানে এক শ্রেণির কলু আছে যারা গরুর বদলে নিজেরাই ঘানি টানে। কলুরা সবরকম তেল প্রস্তÍত করে ও খইল বিক্রয় করে। তিলের খইল সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আগে দিনরাত গরু দিয়ে কাঠের ঘানির সাহায্যে ফোটায় ফোটায় নিংড়ানো খাঁটি সরিষার তেল বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে মাটির হাড়িতে ফেরি করে বিক্রি করা হতো। অবশ্য হাট-বাজারেও ওই তেল বিক্রি করা হতো। এ তেল বিক্রি করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতেন এক শ্রেনীর কলু সম্প্রদায়। এখন কাঠের ঘানির পরিবর্তে প্রযুক্তির আর্শিবাদে লোহার ঘানিতে ভাঙ্গা হচ্ছে সরিষার সাথে বিভিন্ন দ্রব্যাদি। ইলেকট্রিক মোটর দ্বারা লোহার এ ঘানি গুলোতে কেবল সরিষায় নয় তিল, তিশি, পাম ও সোয়াবিনও ভাঙ্গা হয়। তবে কোন কোন লোহার ঘানিতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা সরিষার সাথে চালের গুড়া, পিয়াজ, শুকনা মরিচসহ অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রনে ভেজাল সরিষার তেল উৎপাদন করে। ভেজাল এ কৃত্রিম তেল দখল করেছে তেলের বাজার। কৃত্রিম তেল তারা কম দামে বিক্রি করতে পারলেও কাঠের ঘানিতে কলু সম্প্রদায় দিন-রাত পরিশ্রম করে যে খাঁটি সরিষার তেল উৎপাদন করতেন তা কম দামে বিক্রি করতে পারতেন না। ফলে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে পারছেন না কুলু সম্প্রদায়। এখন কুলু সম্প্রদায় বিলুপ্তপ্রায়। কাজিপুর উপজেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কলু স¤প্রদায়। ঘানি দিয়ে তেল উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রত্যন্ত এলাকাে ও তেলকলের প্রচলন হওয়ায় কমে যাচ্ছে কলুদের কদর। ফলে এসব পরিবারে নেমে এসেছে দুর্দিন। কলুদের অধিকাংশই মুসলমান। হিন্দু কলু থাকলেও তাদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। অন্যান্য মুসলমানদের অর্থাৎ যারা কলু নয় তাদের সঙ্গে একত্রে কলুরা ধর্মকর্ম পালন করে। তারা একই মসজিদে এক সাথে নামাজ পড়ে। কোনো মুসলিম কলুর মৃত্যু হলে বা কলুদের কোনো অনুষ্ঠানে অন্য মুসলমানরাও অংশ নিতে পারে। কিন্তু হিন্দু কলুরা অ-কলু হিন্দুদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে না। তারা নিম্নশ্রেণী হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। ভারতীয় উপমহাদেশে কলুরা তেল নিষ্কাশনের নানা কৌশল ও যন্ত্র ব্যবহার করে থাকত। তিন রকমের তেল নিষ্কাশনের ঘানি আছে, যেমন: দুই বলদে টানা, নালিবিহীন, কাঠের তৈরি ঘানি, এক বলদে টানা, নালিযুক্ত, কাঠের তৈরি ঘানি, এক বলদে টানা, নালিযুক্ত, দুখন্ড কাঠ দ্বারা তৈরি পিঁড়িবিশিষ্ট ঘানি। কলুদের সমাজজীবন বহুলাংশেই বিচ্ছিন্ন। যে গ্রামে তারা বসবাস করে সেখানে তারা নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। দেখা যায় ৫/৭ ঘর কলু পরিবার এক জায়গায় পাশাপাশি বা কাছাকাছি বাস করে। তাদের আত্মীয়তা কলু স¤প্রদায়ের মধ্যে সীমিত। কলুদের পেশা এখন হুমকির সম্মুখীন। যেসব এলাকায় যান্ত্রিক ঘানি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখানে তারা তাদের পেশা টিকিয়ে রাখতে পারেনি। সাধারণত একদিনে অর্থাৎ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি পশুচালিত কাঠের ঘানিতে বড়জোর ২০ কেজির মতো সরিষা পেষা যায়। আর একটি যান্ত্রিক ঘানিতে ওই সময়ের মধ্যে ১০০ কেজির অধিক সরিষা পেশা সম্ভব। কাঠের ঘানিতে গরুকে বিশ্রাম দিতে হয়। সাধারণত গরিব কলুদের একটি মাত্র গরু থাকে। ধনীদের পক্ষে দুটি গরু রাখা সম্ভব। পুঁজি থাকলে সরিষা মজুত রাখা এবং সারাবছর তেল পেষার কাজও থাকে। গরিবের পক্ষে সারাবছর কাজ করা সম্ভব হয় না, তদুপরি তাদের কাঠের ঘানিতে সময়ও বেশি লাগে। যান্ত্রিক ঘানিতে তেলের পরিমাণ বেশি হয়। আধুনিক মেশিনে উৎপাদিত সয়াবিন তেল, সরিষার তেলে এখন বাজার সয়লাব। আর তাই শত শত কলু পরিবার তাদের ঘানি বন্ধ করে এখন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কাজিপুরে এক সময় ৫/৬ শতাধিক কলু পরিবার বাস করত। এ সব পরিবারের লোকজন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সরিষা কিনে বাড়িতে ঘানি টেনে তৈরি করত খাঁটি সরিষার তেল। কিন্তু এখন তেলকলে অল্প সময়ে বেশি তেল উৎপাদিত হওয়ায় এবং এতে তেলের দাম কমে যাওয়ায় ঘানির তেলের চাহিদা কমে যাচ্ছে। ফলে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে পারছে না কলুরা। সব কয়টি ঘানি ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে হেছে। কাজিপুর উপজেলার কুনকুনিয়া উত্তর পাড়ার কলু আমজাদ হোসেন ও মেঘাই গ্রামের আমির হোসেন জানান, আগে প্রতি হাট বার দুই থেকে তিন হাজার টাকার তেল বিক্রি করতাম। এখন বিক্রি হয় তিনশ থেকে চারশ টাকা। বাধ্য হয়ে এখন অন্যের জমিতে কাজ করতে হয়। কিন্তু কৃত্রিম সরিষার তেল বাজার দখল করায় তারা এ ব্যবসা বাদ দিয়ে বিভিন্ন পেশায় আত্মনিয়োগ করেছেন। কাজিপুর ইউনিয়নের মানিকপোটল গ্রামের হবিবার বলেন, আমার বাব/দাদার মুল ব্যবসাই ছিল কাঠের ঘানিতে সরিষার তেল উৎপাদন করা। হামিদ বলেন, আগে আমি বাবার সাথে কাঠের ঘানি দিয়ে তেল উৎপাদন করে বাজার বিক্রয় করতাম, বর্তমানে যুগের পরিবর্তনের এ পেশায় তেমন আর পর্তা (লাভ) না হওয়ায় এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছি।