করোনাতেও শীতের অতিথি পাখির আগমনে মুখরিত জাবি ক্যাম্পাস

0
233

নুর হাছান নাঈম, জাবি প্রতিনিধি 

অতিথি পাখির কলতানে মুগ্ধ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। বাতাসে শীতের ছোয়াঁ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই চারদিকে দেখা মেলে কুয়াশা। কিচিরমিচির শব্দে হঠাৎ গা চমকে ওঠে। মাথার ওপরে নীল আকাশ আর চারদিকের জলাশয়ে অতিথিদের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে জাহাঙ্গীরনগরবাসীর। প্রতিবছর শীতের শুরুতেই এখানে শুরু হয় অতিথি পাখির আনাগোনা। শীতের আগমনী বার্তার সাথে সাথেই হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে অতিথি পাখি দল বেঁধে আসতে শুরু বাংলাদেশে। ঢাকার অদূরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলো মুখরিত এসব পাখির কলতানে । শীত এলেই যেন অন্যরকম প্রান ফিরে পায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বত্র। দূর দুরান্ত থেকে ছুটে আসা অতিথি পাখির বিচরণে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস । এসময় ক্যাম্পাসে ভীড় জমান পাখিপ্রেমী সহ সব বয়সের দর্শনার্থীরা।
অন্যান্য বছর থেকে এবারের চিত্র ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোতে। করোনা ভাইরাসের কারণে দীর্ঘ নয়মাসের বন্ধে ক্যাম্পাসে শুনশান নীরবতা। অফিস খোলার দিন ব্যতিত অন্য দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতুড়ে পরিবেশ যেন মনে হয়েছে পাখ-পাখালির অভয়ারণ্য। পাখিদের কিচিরমিচির,মাঝে মাঝে বাঁদরের লাফালাফি,কাঠবিড়ালির গাছে গাছে দৌড়াদৌড়ি,রাতে জোনাকির মিটমিট আলো,শিয়ালের ডাকাডাকিতে যে কেউ প্রথমে অরণ্যই মনে করবে। পাখিরা এমন পরিবেশে নিজেদের রাজত্বে নিয়েছে ক্যাম্পাসের জলাশয় আর আকাশ। তাইতো জলাশয়গুলোর ইজারা বাতিল করে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করায় এবার আগে ভাগেই আসতে শুরু করেছে অতিথিরা।
দীর্ঘ বন্ধে ক্যাম্পাসের পরিবেশে এসেছে প্রাণচঞ্চলতা। মনে হচ্ছে নিথর দেহে প্রাণ ফিরে এলো। এবারে একটু ভিন্নভাবেই দর্শনার্থী ও শিক্ষার্থীদের বরণ করছে অতিথিরা। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লাল শাপলার মাঝে উড়াউঠি হাজারো পাখির । কিছুক্ষণ পর পর আকাশে দলবেঁধে উড়াল দিয়ে ছুটে চলছে এক লেক থেকে অন্য লেকে । বিশেষ করে ক্যাম্পাসের পরিবহন চত্ত্বরের পাশের লেক, লন্ডন ব্রিজ, সুইমিংপুলের পাশে লেকগুলোতে এবছর অতিথি পাখির আনাগোনা অন্য বছরের চেয়ে অনেক বেশি। ডানা ঝাপটিয়ে পাখিরা পানিতে দেয় ঢেউয়ের তরঙ্গ।
শীতের তীব্রতা ও খাবারের সংকট থেকে বাঁচতে প্রতিবছর সাইবেরিয়া,চীন ,মঙ্গোলিয়া,নেপাল থেকে অক্টোবরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের জলাশয়গুলোতে আসতে থাকে অতিথিরা। তার উল্লেখযোগ্য একটা অংশ আসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোতে ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট-বড় ১২ টি জলাশয় রয়েছে। এরমধ্যে প্রশাসনিক ভবনের সামনের জলাশয়, জাহানারা ইমাম ও প্রীতিলতা হল সংলগ্ন জলাশয়, ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের ভেতরের জলাশয়, সুইমিংপুল এলাকার  জলাশয়ে অতিথি পাখির আধিক্য দেখা যায়।
খায়রা, চখাবালি, বালিহাঁস ,কাদাখোঁচা, হেরণ, কার্লিউ, বুনোহাঁস, ছোটসারস, বড়সারস,সরালি,পিচার্ড,মানিকজোড়,জলপিপি,ফ্লাইপেচারসহ নানা নামের পাখির আগমনে মুখরিত এখন ক্যাম্পাস। তবে এবার সরালি পাখির সংখ্যাটা একটু বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের তথ্যমতে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়গুলোতে ১৯৮৬ সালে সর্বপ্রথম অতিথি পাথি  আসতে শুরু করে । তখন ক্যাম্পাসে ল্যাঞ্জা হাঁস,কার্কেনী, সরালি সহ ৪-৫ প্রজাতির পাখি আসে। এর পর আস্তে আস্তে পাখিদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে ক্যাম্পাসের লেকগুুলোতে ৫০-৬০ প্রজাতির পাখি আসে।

লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের হাসান বলেন, অতিথি পাখিদের আগমন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে ভিন্নভাবে পরিচিত করেছে। জাহাঙ্গীরনগরের সবুজ প্রকৃতির সাথে অতিথি পাখি যুক্ত হয়ে অন্যরকম সৈৗন্দর্য সৃষ্টি করেছে। উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়ায় এবার পাখির উপস্থিতি বেশ সন্তোষজনক। তাই আমাদের সচেতনতা এসব পাখিদের আসার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পাখি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের আয়োজনে প্রতিবছর পাখিমেলার  আয়োজন করা হয়। পাখি গবেষক প্রাণীবিদা বিভাগের অধ্যাপক ড.মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ ভোরের কাগজের সাথে আলাপকালে বলেন, ‘পাখিদের প্রতি সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবছর জানুয়ারী মাসে ক্যাম্পাসে পাখিমেলার আয়োজন করা হয়। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর ক্যাম্পাসে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা অনেক বেশি। পাখি আসার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে জলাশয় ঘেঁষে কোলাহল করা, গাড়ির হর্ণ বাজানো, শব্দ দূষণের মাত্রা কমিয়ে এনে পাখিদের নিরাপদ অভয়ারণ্য সৃষ্টির লক্ষ্যে মেলায় বিশেষ নজর দেয়া হয় বলে তিনি জানান। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালের বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক লিফলেট ও বিলবোর্ড টানানো হয়েছে।’
ক্যাম্পাসে এখন লেকগুলো জুড়ে পাখি আর পাখির কলতান। পাখিদের জলকেলির দৃশ্য দেখে দুই নয়ন ভরে যায়। প্রতিদিনই অতিথি পাখি দেখতে ক্যাম্পাসে আসছেন অনেক দর্শনার্থী। মতিঝিল থেকে সপরিবারে পাখি দেখতে এসে ওমর ফারুক বলেন, প্রকৃতির সবুজের সাথে পাখির কলতান একটা নৈস্বর্গিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। শাপলা ফুলের মাঝে পাখিদের জলকেলি আমাকে মুগ্ধ করেছে। নগরীর ব্যস্ততা রেখে পরিবার ও সন্তানদের পাখিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে এখানে এসেছি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, করোনার মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে কিছু কিছু দর্শনার্থী কোন রকম সর্তকতা অবলম্বন না করে মাস্ক,হ্যান্ডস্যানিটাইজার ছাড়া গাদাগাদি করে ক্যাম্পাসে অতিথি পাখির বিচরণ দেখতে আসে। কিন্তু অনেক সময় যেখানে সেখানে মাস্ক ও খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন করে তুলে।
শীতপ্রধান দেশসমূহে এইসময়ে প্রচুর তুষারফাত হওয়ায় পাখিদের খাদ্য ঢেকে যায়। জীবন বাচাঁতে ও খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পাখিগুলো বাংলাদেশে আসে। আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালে সাইবেরিয়ান দেশগুলোতে হালকা শীত থাকে।
হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আসা অতিথি পাখিদের যাতে কোন অসুুবিধা না হয় সেজন্য পাখিদের বিরক্ত না করতে পাখিপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের অনুরোধ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।