কবির হোসেন’র একগুচ্ছ কবিতা

6
184

তলপেটের ব্যথা


রশি দিয়ে মানুষ বেঁধে রাখা হয় নাকি মানুষ দিয়ে রশি?—তর্ক যেদিকেই গড়াক না কেনো, মানুষ মুক্ত হলে জানি রশিও মুক্ত হয় অথবা রশি মুক্ত হলে মুক্ত হয় মানুষ! আমারও কোথায় যেন প্যাচ লেগে আছে, তলপেটের ব্যথার মতো চিনচিনিয়ে ওঠে। আমাকেও কি বেঁধে রাখা হয়েছে অথবা আমাকে দিয়ে কাউকে? জানি না কোথায় সেই বাঁধন, কোথায়ইবা বাঁধনের যন্ত্রণা! আমি কেবল ব্যথা পাই, কিসের টানে যেন আমার সেন্টার ছিঁড়ে যায়!
নাভিতে হাত দিয়ে বুঝি—নিজের সাথেই গিট লেগে থাকা আমি এক আশ্চর্য রশি!

.
আকাশিগাছের গোড়াপত্তন


আকাশকে আগুনে ফুটিয়ে আবিষ্কার করা হয়েছিল—মেঘগুলো হাওয়ার সাথে উড়ে যায় আর পাতিলের তলায় জমে থাকে নীল রঙের উদাসিনতা। এইসব উদাসিনতা উর্বর মাটিতে রোপণ করলে একেকটা গাছ হয়ে ওঠে, আর পাতাগুলো হয়ে ওঠে মেঘ। গাছের গোড়ায় নিয়মিত শরত ঢেলে দেখেছে পাতাগুলো সাদা হয়ে ওঠে, আর বর্ষা দিলে হয়ে ওঠে ঘনকালো দুধেল। বর্ষাকালই আকাশিগাছের শীতকাল, সামান্য হাওয়াতেই পাতাগুলো ঝরে পড়ে বৃষ্টি হয়ে।

বৃষ্টির জল শুকিয়ে, পাতিলের তলা থেকে নীল রঙের বীজ তৈরী হয়।

.

হাতুড়ে ডাক্তার


হাতুড়ির ঘ্রাণ পেতেই কাঠের শরীরে লোমের মতো পেরেকগুলো জেগে ওঠে, কাঠের ক্ষতগুলো কাঁচা হয়ে ওঠে ক্রমশ। পেরেকের কাঁপুনি রোগে ক্ষতগুলো গর্ত হয়ে ওঠে। আর কাঠের ঘরটি যেন বাতের ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে, গিঁটে গিঁটে ব্যথা হয় যেন আমাবস্যার আঘাতে। কাঠ চেয়েছিল হাতুড়ির ভয়ে কাঁপতে থাকা পেরেকের বেরিয়ে আসাতে সাঁড়াশি অভিযান চলুক অথবা কোনো কবিরাজ জিকির করতে করতে বাণ দেওয়া তাবিজের মতো তুলে আনুক পেরেকগুলো।

অথচ একজন হাতুড়ে ডাক্তার, ঘরের যেখানে যেখানে ব্যথা সেখানে সেখানে হাতুড়ি চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে!

.

চাঁই


অন্ধকার সব নদীতে, আলকাতরা ঢেউ ঢেউ খেলতো আর আমরা ঝাঁকিজালের মতো মশারি ছড়িয়ে দিতাম চুপিসারে—মাছের মতো কতো কতো মশা উঠে আসতো জালে! এখন আর সে-সব নদী নেই, তৃষ্ণার্ত বিদ্যুতের চুমুকে কেবলি শূন্য গ্লাস। কিছু নদী অবশ্য আটকে আছে ঝোপঝাড়ে। তবে ঝোপঝাড় ঝাঁকিজাল বিরোধী বলে, মশারি থেকে আমাদের একদিন ঝাঁকিজালের ধারণা গুটিয়ে ফেলতে হয়, আসতে হয় মশারি পেতে রাখার ধারণাতে। মশারি টানাতেই যখন দেখি মশারির ভেতরে ঢুকতে মশা দলে দলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমরা মশারিতে বড় বড় ফাঁদ-ফুটো করে চাঁই পেতে রাখার সিদ্ধান্তে আসি।

এখন ভেতরে মানুষের আদার রেখে, মশারি পেতে রাখি মশা ধরতে!

.

অতিথি পাখি


শীতের সাথে বর্ডার টপকে সাথি-সঙ্গীরা চলে গেছে, কেবল একটি পাখি বসন্তের প্রেমে পড়ে থেকে যায়। যেভাবে বসন্তে থেকে যায় শীতের কিছু বাসি কুয়াশা। সেসব কুয়াশার সাথেই পাখিটি গোটা বসন্ত ঘুরে বেড়ায়, আর গ্রীষ্মের তাপে কুয়াশা উধাও হলে ছটফট করতে থাকে শীতের প্রার্থনাতে। হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে শীতকাল, খুঁজতে থাকে সাথি-সঙ্গীদের। তারপর শহরের শীততাপনিয়ন্ত্রিত সেলুনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শীতকালগুলোর একটাতে ঢুকে পড়ে, আর আয়নাঘেরা সেলুনের ভেতরে দেখে ফিরে পেয়েছে সঙ্গীদেরও।

সেলুনের ভেতরে একাকী একটি অতিথি পাখি, দলবেঁধে উড়ে বেড়ায় সারাজীবন!

.

ধূসর রাত


আগে কেবল জোৎস্নার অত্যাচার ছিল—হুটহাট রাতের জমিনে সাদা পাউডার ছিটিয়ে দিত। তারপর একদিন বিদ্যুৎ ওয়াশিং মেশিনে রাতকে আচ্ছা মতো ধুয়ে দিলো। আর আমাদের কালো চাদর রং উঠে হয়ে গেলো ধূসর। ধূসর রাত এখন কাউকে আর তেমন আড়াল করতে পারে না, পারে না আলোকে আর অতোটা উজ্জ্বল করতে। জোনাকিরাও যেন খুব ক্লান্ত হয়ে গেছে, নিজেদের হারিকেন নিভু নিভু করছে।

শুনেছি জোনাকিরা ইদানিং গোপনে কেরোসিন পান করে!

.

পাঁচটাকার কয়েন


পাঁচটাকার একটি কয়েন দাঁড়িপাল্লায় মেপে দেখি ওজন পাঁচটাকাই! তার ওপর একটাকার আরেকটি কয়েন রাখি, আর আশ্চর্য হয়ে দেখি—ওজনে কোনো তারতম্য ঘটেনি। পাঁচটাকার কয়েনটি নিজের ওজন থেকে সরে দাঁড়ায়নি একবিন্দুও, একটাকার সাথে মিলে যায়নি ছয়টাকার ওজনে। একটাকার সাথে যেন তার দ্বন্দ্ব চলছে, অথবা মিশতে বারণ আছে। পাল্লার অপর পাশে একটাকার গুনে গুনে ছয়টি কয়েন রেখে দেখেছি, ওজনে আসে না সে সমান হতে।

পাঁচটাকার একটি নোট রাখতেই দেখি—দৌড়ে আসে ওজনে সমান হতে!

.

রসের আলাপ


তালগাছের সাথে খেজুরগাছের রসের আলাপ হয়, তবুও কোনো সমাধান আসে না। যার যার রসের হাঁড়ি সে সে ঢেকে রাখে—আগলে রাখে যেন গোপনীয়তা যার যার হাঁড়িতে। দু’জনার রস একসাথে মিশিয়েও দেখেছি—যদি একটা কিছু হয় তাদের! দেখি—তেল আর জলের মতো সীমানা জেগে থাকে। আর পান করে দেখি দু’জনার রস স্বাদেও নিজস্বতা ধরে রেখেছে। রস মিষ্টি-মধুর হোক না যত তবুও তো সে ঘোলাজল, আমি তো চেয়েছি জলের মতো পরিষ্কার কোনো রস।

ঘাসের গলায় তাই হাঁড়ি পেতেছি, শিশির ধরবো বলে!