ইটভাটায় রাজস্ব বঞ্চিত সরকার: ইট প্রস্তুতে বনের কাঠ আর পাহাড়ের মাটি

0
224

মুুহাম্মদ জামাল উদ্দীন, লামা (বান্দরবান) থেকে 

পার্বত্য বান্দরবানসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং প্রকৃতি ইটভাটার দুষিত ধোঁয়ায় মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। একের পর এক অবৈধ ইটভাটা স্থাপন করা হচ্ছে সংরক্ষিত বন, পাহাড়ের পাদদেশ, লোকালয়ে এবং উর্বর ফসলি জমিতে। এক্ষেত্রে সরকারের সকল ধরণের বিধি নিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে যাচ্ছে এলাকাভিত্তিক ইটভাটা মালিক নামক সংঘবদ্ধ চক্র। যার কারণে একদিকে যেমন গর্ভবতী-মা ও শিশু এবং স্থানীয় জনসাধারণ শ্বাসকষ্ট সহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অপরদিকে সরকার এসব ইটভাটা থেকে কোনো ধরণের রাজস্ব পাচ্ছে না। ধ্বংস হচ্ছে পাহাড়, পরিবেশ, ফসলি জমি ও প্রকৃতি।

যদিও ইটভাটা স্থাপনে ১৯৯০ সালের ২৫ জুলাই সরকারের জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপন বলা হয়, প্রত্যেক জেলা প্রশাসন ইটভাটা নির্মাণে আবেদনের ক্ষেত্র সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করে অর্নুবর অকৃষি জমিতে ইটভাটা নির্মাণের অনুমোদন দেবে। যত্রতত্র ইটভাটা না হয়ে ইটভাটা হবে নদীর তীরে অথবা বিশেষ কোনো এলাকার সর্বোচ্চ দেড় একর জায়গার উপর।

সরকারের ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ি ইট পোড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকায় জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করে অনুমতিপত্র নেয়ার বিধাণন রয়েছে। এই আইনটির ধারা ৫-এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ইট পোড়াানোর জন্য জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করতে পারবে না। তবে সরকারের এসব প্রজ্ঞাপন ও আইনের কাগজের মধ্যেই সিমাবদ্ধ রয়েগেছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের হিসাবে মতে দক্ষিণ চট্টগ্রামে ৯৮টি ইটভাটা রয়েছে। এরমধ্যে লোহাগাড়ায় ১৫টি, সাতকানিয়ায় ৩৮টি, চন্দনাইশে ৩১টি, আনোয়ারায় ২টি, বাঁশখালীতে ২টি, বোয়ালখালীতে ৭টি এবং পটিয়ায় ৩টি ইটভাটা রয়েছে।

একইভাবে বান্দরবান জেলা প্রশাসন সূত্রে জানাগেছে দেড়শ’র অধিকর ইটভাটা রয়েছে পাহাড়ি এই জনপদে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে জেলার লামার ফাইতং ইউনিয়নে। ওই একটি ইউনিয়নেই রয়েছে ৩৩টি ইটভাটা। এছাড়া ফাঁসিয়াখালি, লামা পৌরসভা, গজালিয়া, সরই, আলীকদম, বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও নাইক্ষ্যংছড়িতে বন ও ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের রেকর্ডপত্রে বলছে, এসব ইটভাটার অধিকাংশই অনুমতি ও ছাড়পত্র ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে।

লোহাগাড়ার ইটভাটা মালিক সমিতির একাধিক সদস্য আলাপকালে জানান, জেলা প্রশাসনের হিসেব মতে দক্ষিণ চট্টগ্রামে ৯৮ ইটভাটা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে ভিন্ন। শুধুমাত্র লোহাগাড়া উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে রয়েছে ৫৮টি ইটভাটা। সবগুলো ইটভাটাইতে পাহাড়ের মাটি দিয়ে ইট তৈরি ও কাঠ জ্বালিয়ে পোড়ানো কার্যক্রম চলছে। এরমধ্যে উপজেলার চরম্বা ইউনিয়নেই রয়েছে ২০টি। সংরক্ষিত বনাঞ্চল, জ্বালানি কাঠ ও মাটি নাগালে পাবার কারণে এই এলাকায় সবচেয়ে বেশি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। একই কথা বলেন লামা ফাইতং ও আজিজনগরের ইটভাটা মালিকগণ। তাদের ভাষ্য সহজে ইট তৈরিতে পাহাড়ের মাটি ও জ্বালানিতে বানের কাঠ ব্যবহার করা যায়।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের থেকে দেয়া তথ্য মতে, ‘একটি ইটভাটা স্থাপনের আগে পরিবেশ অধিদফতর, জেলা প্রশাসন, বিএসটিআই ও স্থানীয় ভূমি অফিসসহ আরও কয়েকটি সংস্থা থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। সবগুলো ছাড়পত্র না পেলে ইটভাটা তৈরির সুযোগ নেই। এরপরও অসাধু কিছু ব্যক্তি নিয়মনীতি না মেনে ইটভাটা তৈরি করছে।

অভিযোগ উঠেছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামে উর্বর ফসলি জমি এবং বান্দরবানে বন ও পাহাড়ের পাদদেশে ইটভাটা স্থাপন করেছে এলাকাভিত্তিক সংঘবদ্ধ সি-িকেট। সরকারের ক্ষমতার পালা বদলের সাথে সাথে এসব ইটভাটা মালিকদের রাজনৈতিক খোলসও পাল্টায়। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী পরিচয়ে কোনো ধরণের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই ইটভাটা ব্যবসা পরিচালনা করছে এই সি-িকেট। এসব দেখেও রহস্যজনক কারণে নিরব ভূমিকা পালন করছে উপজেলা-জেলা প্রশাসন এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। একেইভাবে সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরাও রয়েছে একেবাওে ঘুমের ঘরে।

লোহাগাড়ায় ইটভাটা স্থাপন চক্রে রয়েছে, নুরুল হক কোম্পানী, মোনাফ কোম্পানী, জাহাঙ্গীর কোম্পানী, ইদ্রীস কোম্পানী, হারেছ কোম্পানী, জনু কোম্পানী (চুনতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান), আইয়ুব মিয়া (আধুনগর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান), শাহ আলম কোম্পানী গং, নুরুল আলম কোম্পানী, পারভেজ কোম্পানী, বাদশাহ হাজী, ব্রিকফিল্ড মালিক সমিরি সভাপতি শাহাবুদ্দিন চৌধুরী ও সেক্রেটারি সরওয়ার কোম্পানীসহ ৫০/৬০ জন মালিক সিন্ডিকেট করে এই ব্যবসা করে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ জানান, ইটভাটার জ্বালানিতে সৃষ্ট কার্বন ডাই-অক্সাইড ও সালফার- ডাই অক্সাইডসহ বিভিন্ন ধরনের দুষিত ধোঁয়া ইটভাটা থেকে নির্গত হয়ে বাতাসে সাথে মিশে যায়। এসব দুষিত বাতাস গ্রহণ করায় মানুষ শ্বাস কষ্ট সহ বিভিন্ন মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হন। এরমধ্যে অতিদ্রুত আক্রান্ত হয় নবজাতক, শিশু ও বৃদ্ধরা। বিশেষ করে এসব দুষিত ধোঁয়ার কারণে গর্ভবতী মা ও শিশুদের শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত হন বেশি। এ

স্থানীয় পরিবেশ সচেতন মহলের ক্ষোভ, প্রতি বছরের মতো এবারও স্থানীয় প্রতিটি ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিপুল পরিমাণ পাহাড়ি কাঠ মজুত করা হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই ইট পোড়ানোর কাজ শুরু হবে। এছাড়া পাহাড়ের মাটি এবং ফসলি জমির উপরের স্তর কেটে মাটি নেয়া হয়েছে ইট তৈরির জন্য। অনুমতি ও ছাড়পত্র ছাড়া এসব ইটভাটা পরিচালিত হলেও রহস্যজন কারণে প্রশাসন নীরব রয়েছে।

তারা আরো জানান, প্রতি মৌসুমে প্রস্তুতকৃত ইট পরিবহণের ট্রাক অবাধ চলাচলের কারণে গ্রামিণ সবগুলো সড়ক ধসে পড়েছে। ওইসব সড়ক দিয়ে এলাকার সাধারণ জনগণ চলাচল করতে পারেন না। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা স্কুল কলেজ যেতে হয় অনেকদূর ঘুরে জমি ও খাল বিল ডিঙ্গিয়ে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসাম বাবিব জিতু এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিলুফার ইয়াছমিন চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তর এর সিনিয়র কেমিস্ট এ কে এম ছামিউল আলম কুরসি বলেন, অবৈধ পাহাড় কর্তন বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এর ৬খ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

LEAVE A REPLY